শৈলকুপায় ভূমি সেবা সপ্তাহ উপলক্ষে জনসচেতনতামূলক সভা: ডিজিটাল সেবায় কমছে হয়রানি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে জমিজমা বা ভূমি সংক্রান্ত বিষয় মানেই একসময় ছিল দীর্ঘমেয়াদি হয়রানি, মামলার ভয় আর দালালদের দৌরাত্ম্য। একটি ছোট কাজের জন্য ভূমি অফিসে মাসের পর মাস ঘুরতে হতো গ্রামের সহজ-সরল কৃষকদের। তবে সেই দিন এখন অনেকটাই বদলে গেছে। মানুষকে তাদের অধিকার সম্পর্কে জানাতে এবং ঘরে বসে সেবা নেওয়ার পদ্ধতি শেখাতে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় পালিত হচ্ছে ‘ভূমি সেবা সপ্তাহ’। এই উপলক্ষে মঙ্গলবার সকালে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক বিশাল জনসচেতনতামূলক সভার আয়োজন করা হয়।

শৈলকুপা উপজেলা প্রশাসন ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড কার্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে এই চমৎকার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে মূল আলোচনার বিষয় ছিল কীভাবে সাধারণ নাগরিকরা কোনো রকম হয়রানি ছাড়া খুব সহজে ভূমি সেবা পেতে পারেন। অনলাইন নামজারি, ঘরে বসে ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা প্রদান এবং জমির পর্চা উত্তোলনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। গ্রামের সাধারণ মানুষ যাতে দালালদের খপ্পরে পড়ে আর আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেই লক্ষ্যেই এই সচেতনতামূলক সভার ডাক দেয় উপজেলা প্রশাসন।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহফুজুর রহমান। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ১০০% ডিজিটাল করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আগে একটি নামজারি বা মিউটেশন করতে গিয়ে দালালদের পেছনে সাধারণ মানুষের ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি খরচ হয়ে যেত। এখন সেই দিন শেষ। মানুষ এখন সরাসরি অনলাইনে আবেদন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন। সাধারণ মানুষকে আর ভূমি অফিসে এসে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয় না।

অনুষ্ঠানে ভূমি সেবার বিভিন্ন কারিগরি দিক ও সহজলভ্যতা নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেবাশীষ অধিকারী। তিনি উপস্থিত সবাইকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কীভাবে জমির তথ্য যাচাই করতে হয়, তা হাতে-কলমে বুঝিয়ে দেন। তিনি জানান, বর্তমানে ভূমি অফিসে না এসেই নাগরিকরা যেকোনো জায়গা থেকে অনলাইনে ই-নামজারির আবেদন করতে পারেন। এমনকি কিউআর কোড যুক্ত পর্চা এখন ডাকযোগেও বাড়িতে পৌঁছে যাচ্ছে। এই ডিজিটাল পদ্ধতির কারণে ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের হয়রানি প্রায় ৮০% কমে গেছে। কোনো সমস্যা হলে সরাসরি ১৬১২২ নম্বরে কল করে মানুষ তাদের অভিযোগও জানাতে পারেন।

এই জনসচেতনতামূলক সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান। যেহেতু কৃষি কাজের সাথে জমির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, তাই কৃষকদের জন্য জমির সঠিক কাগজ থাকা কতটা জরুরি, তা নিয়ে তিনি কথা বলেন। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এই সভায় অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। বক্তারা সবাই একমত প্রকাশ করেন যে, দালালমুক্ত ও স্বচ্ছ ভূমি সেবা নিশ্চিত করতে সরকারের এই ডিজিটাল উদ্যোগগুলো সাধারণ মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। সাধারণত জমিজমার বিষয়ে তরুণ বা শিক্ষার্থীরা খুব একটা মাথা ঘামায় না। কিন্তু এই অনুষ্ঠানে তাদের জন্য একটি বিশেষ প্রশ্নোত্তর পর্বের আয়োজন করা হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা ই-নামজারি ও অনলাইনে খাজনা দেওয়ার বিষয়ে নানা ধরনের কৌতূহলী প্রশ্ন করে। কর্মকর্তারা অত্যন্ত সহজ ভাষায় তাদের প্রশ্নের উত্তর দেন। প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হলো, এই শিক্ষার্থীরা যদি প্রযুক্তির ব্যবহার শিখে যায়, তবে তারা বাড়িতে গিয়ে তাদের বাবা, চাচা বা দাদাদের অনলাইনে জমির খাজনা দিতে সাহায্য করতে পারবে। এর ফলে প্রযুক্তিগত অজ্ঞতার কারণে কেউ আর দালালদের প্রতারণার শিকার হবে না।

সভা শেষে উপস্থিত সবাই ভূমি সেবা সপ্তাহের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান। বক্তারা সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনারা নিজেদের কাজ নিজেরা করতে শিখুন, কোনো তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভর করবেন না। সরকার আপনাদের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে প্রস্তুত। একটু সচেতন হলেই আপনাদের মূল্যবান সময় এবং কষ্টার্জিত অর্থ দুটোই বাঁচবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শৈলকুপা উপজেলার ভূমি ব্যবস্থাপনা একটি মডেল হিসেবে গড়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করে অনুষ্ঠানের সফল সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ