শান্তিচুক্তি না হলে ইরানের জন্য ‘খুব খারাপ সময়’ অপেক্ষা করছে: ডোনাল্ড ট্রাম্প

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানের প্রতি অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি খুব পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে চলমান সংকট নিরসনে খুব শিগগিরই কোনো কার্যকর শান্তিচুক্তি না হলে ইরানের জন্য সামনে ‘খুব খারাপ সময়’ অপেক্ষা করছে। গত শনিবার ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম বিএফএমটিভিকে (BFMTV) দেওয়া এক বিশেষ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি এই কড়া বার্তা দেন। চীন সফর শেষে দেশে ফিরেই ট্রাম্পের এই আগ্রাসী বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।

সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, একটি সম্মানজনক চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে খোদ ইরানেরও যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। কারণ, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। পাল্টাপাল্টি হামলার জবাবে ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জলপথ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় প্রতিদিন বিশ্ব অর্থনীতিতে কয়েক শ মিলিয়ন ডলার ($) সরাসরি ক্ষতি হচ্ছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০% এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি বিশাল অংশ এই প্রণালি দিয়ে পার হয়। তাই একটি দ্রুত সমাধান এখন সারা বিশ্বের জন্যই জরুরি।

ট্রাম্পের এমন আগ্রাসী ও হুমকিমূলক বক্তব্যের পর ইরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই। ভারতের নয়া দিল্লিতে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে যোগ দিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত শুক্রবার গণমাধ্যমকে জানান, নতুন করে শান্তি আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে একটি বার্তা পেয়েছেন। তবে তিনি সোজাসাপটা জানিয়ে দেন, ওয়াশিংটনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে তেহরানের মনে এখনো ১০০% ‘অবিশ্বাস’ রয়ে গেছে। কারণ এর আগেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যখন আলোচনা চলছিল, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র বিনা উসকানিতে দেশটির ওপর অন্তত দুবার বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছিল। তাই আমেরিকার কথায় ইরান আর সহজে ভরসা করতে পারছে না। আব্বাস আরাগচি স্পষ্টভাবে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি একটি ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তির জন্য সত্যিই প্রস্তুত থাকে, তবেই তারা আলোচনার টেবিলে বসবেন। অন্যথায় নিজেদের অধিকার রক্ষায় ইরান যেকোনো ধরনের সামরিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেও পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প খুব শিগগিরই ইরান নিয়ে বড় ধরনের এবং চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। চীন সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে আলোচনার পর ট্রাম্প দেশে ফিরেছেন। এরপরই পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তারা নতুন সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। গত কয়েক দিনের আলোচনা যদি ব্যর্থ হয়, তবে ট্রাম্প আরও বেশি বোমা মেরে বর্তমান এই সামরিক অচলাবস্থা ভাঙার কড়া সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এমন একটি ভয়ংকর পরিস্থিতি মাথায় রেখে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টারা ইতিমধ্যে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের নতুন অভিযান শুরু করার সব নকশা ও পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে রেখেছেন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইসরায়েলের সাথেও নিবিড়ভাবে যোগাযোগ রাখছে যুক্তরাষ্ট্র।

তবে হোয়াইট হাউসের ভেতরের খবর হলো, ট্রাম্প তার পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো ফয়সালা নেননি। বরং এই সংঘাতের সাথে জড়িয়ে থাকা অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্মকর্তারা একটি সম্মানজনক সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তারা মূলত ইরানকে বুঝিয়ে হরমুজ প্রণালি আবার সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খুলে দেওয়ার পদক্ষেপ নিচ্ছেন। বন্ধুরাষ্ট্র পাকিস্তানের সরাসরি মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল থেকে দুই দেশের মধ্যে যে নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি চলছে, তাকে একটি স্থায়ী রূপ দিতেই এই পর্দার আড়ালের কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ চলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কূটনৈতিক চেষ্টায় যদি হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া যায়, তবে ট্রাম্প খুব সহজেই নিজেকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করতে পারবেন। আগামী নির্বাচনের আগে তিনি মার্কিন ভোটারদের বোঝাতে পারবেন যে, ইরানে চালানো এই ব্যয়বহুল ও প্রাণঘাতী সামরিক অভিযান পুরোপুরি সফল ছিল। যুদ্ধে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক বিলিয়ন ডলার ($) খরচ হয়ে গেছে। তাই দেশের সাধারণ করদাতাদের কাছে এই বিশাল অঙ্কের সামরিক খরচকে যৌক্তিক প্রমাণ করা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে ভীষণ দরকারি। অন্যথায় তাকে দেশের ভেতরে চরম রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও সংঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এর ক্ষতিকর প্রভাব সরাসরি আমাদের বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোতেও এসে লাগছে। জ্বালানি তেলের দাম বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেলে ১০

থেকে১৫থেকে১৫

 (ডলার) বেড়ে গেলে আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি অন্তত ৫% থেকে ১০% বেড়ে যাওয়ার চরম আশঙ্কা থাকে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আমাদের লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর দেশের অর্থনীতি অনেকটা নির্ভরশীল। যুদ্ধ পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে তাদের কর্মসংস্থান মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। তাই ট্রাম্প ও ইরানের এই কূটনৈতিক এবং স্নায়বিক লড়াই শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে, বিশ্ববাসী এখন সেদিকেই গভীর উদ্বেগের সাথে তাকিয়ে আছে।

Donald-Trump

সম্পর্কিত নিবন্ধ