ঝিনাইদহ জেলার অন্যতম একটি উর্বর ও গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা হলো শৈলকুপা। গড়াই ও কুমার নদের পলিবাহিত এই জনপদের মানুষের জীবন ও জীবিকা প্রধানত কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এখানকার মাটি যেমন উর্বর, তেমনি মানুষের প্রধান পেশা ও বেঁচে থাকার অবলম্বন হলো হাড়ভাঙা কৃষিকাজ। একটা সময় ছিল যখন শৈলকুপার কৃষকদের জীবন চলত সম্পূর্ণ প্রকৃতির খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করে। কাকডাকা ভোরে লাঙল আর কাঁধে জোয়াল নিয়ে কৃষকের মাঠে যাওয়ার দৃশ্য ছিল এখানকার চিরচেনা রূপ। সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতে গিয়ে কৃষকের শ্রম যেত বেশি, কিন্তু লাভের খাতা প্রায়ই শূন্য থাকত। তবে সময়ের আবর্তনে সেই পুরোনো হতাশার দিন এখন অনেকটাই বদলে গেছে। শৈলকুপায় কৃষি খাতে আধুনিকায়নের ছোঁয়া লেগেছে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে। সনাতন পদ্ধতির বদলে মাঠে মাঠে এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আধুনিক যন্ত্রপাতি। এই পরিবর্তনের ফলে কৃষকদের শুধু যে শারীরিক কষ্ট কমেছে তা নয়, বরং ফসলের উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন ও শক্তিশালী গতির সঞ্চার হয়েছে।
সনাতন পদ্ধতি থেকে যান্ত্রিকীকরণে উত্তরণ
কৃষিতে আধুনিকায়নের সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান দিকটি হলো যান্ত্রিকীকরণ। শৈলকুপার গ্রামের মেঠো পথ ধরে হাঁটলে এখন আর আগের মতো লাঙল-জোয়াল দিয়ে জমি চাষ করার দৃশ্য খুব একটা চোখে পড়ে না। এর জায়গা পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে আধুনিক ট্রাক্টর আর পাওয়ার টিলার। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে ধান বা গম কাটার মৌসুমে। আগে ফসল কাটার সময় তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিত, ফলে কৃষকদের চরম বিপাকে পড়তে হতো। বেশি মজুরি দিয়ে শ্রমিক রাখলে কৃষকের লাভ বলে আর কিছুই থাকত না। কিন্তু এখন ‘কম্বাইন হারভেস্টার’ মেশিনের সাহায্যে খুব অল্প সময়ে এবং কম খরচে ফসল কাটা, মাড়াই করা ও বস্তাবন্দি করা সম্ভব হচ্ছে। এই যান্ত্রিকীকরণ কৃষকদের হাড়ভাঙা শ্রম ও মূল্যবান সময় দুটোই দারুণভাবে বাঁচাচ্ছে।
উচ্চ ফলনশীল বীজ ও সুষম সারের ব্যবহার
আধুনিক কৃষিতে আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো বীজের গুণগত মান ও সারের পরিমিত ব্যবহার। শৈলকুপার কৃষকরা এখন আর আগের মতো স্থানীয় বা কম ফলনশীল জাতের বীজের ওপর নির্ভরশীল নন। তারা কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে উফশী (উচ্চ ফলনশীল) এবং হাইব্রিড জাতের ধান, গম, পেঁয়াজ ও সবজির আবাদ করছেন। আগে কৃষকরা আন্দাজের ওপর জমিতে সার দিতেন, যার ফলে অনেক সময় মাটির গুণাগুণ নষ্ট হতো এবং ফসলের ক্ষতি হতো বা খরচ বেড়ে যেত। এখন তারা মাটি পরীক্ষা করে সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করছেন, যা মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখার পাশাপাশি ফসলের উৎপাদন বাড়াতে জাদুর মতো কাজ করছে।
সেচ ব্যবস্থায় সৌরবিদ্যুৎ ও নতুন প্রযুক্তি
কৃষিকাজে সেচ দেওয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, পাশাপাশি এটি একটি বড় খরচের জায়গাও বটে। আগে ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে সেচ দিতে গিয়ে কৃষকের লাভের বড় অংশই জ্বালানি খরচে চলে যেত। তবে বর্তমানে শৈলকুপার অনেক মাঠে সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্প বা সোলার পাম্প বসানো হয়েছে। এতে পরিবেশের ক্ষতিও হচ্ছে না, আবার কৃষকের সেচ খরচও অনেকটা কমে এসেছে। এছাড়া সবজি ও ফলের বাগানে অনেক কৃষক এখন ‘ড্রিপ ইরিগেশন’ বা বিন্দু সেচ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। এই পদ্ধতিতে গাছের গোড়ায় ফোঁটায় ফোঁটায় জল পৌঁছায়, ফলে পানির কোনো অপচয় হয় না এবং ফসল তার প্রয়োজনীয় রসটুকু ঠিকমতো পায়।
মালচিং ও পলিনেট হাউসের মাধ্যমে সবজি চাষ
শৈলকুপা বরাবরই পেঁয়াজ ও সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত। এখানে এখন বাণিজ্যিকভাবে প্রচুর সবজি ও ফল চাষ হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে ‘মালচিং’ পদ্ধতি এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। বেড তৈরি করে পলিথিনের মালচিং পেপার দিয়ে ঢেকে টমেটো, শসা, তরমুজ বা মরিচ চাষ করলে মাটিতে আর্দ্রতা ধরে রাখা যায় এবং আগাছা জন্মায় না। সারের অপচয়ও রোধ হয়। এছাড়া অসময়ের ভারী বৃষ্টি বা তীব্র রোদ থেকে মূল্যবান ফসল বাঁচাতে অনেক কৃষক এখন জমিতে ‘পলিনেট হাউস’ তৈরি করছেন। এর ফলে শৈলকুপায় সারা বছর জুড়েই নিরাপদ ও বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে, যা বাজারে অনেক ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে।
শিক্ষিত তরুণদের কৃষিতে আগ্রহ ও স্মার্ট ফার্মিং
কৃষিকে একসময় কেবল অশিক্ষিত বা গরিব মানুষের পেশা বলে মনে করা হতো। কিন্তু শৈলকুপায় এখন সেই পুরোনো ধারণা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ পেরোনো অনেক শিক্ষিত তরুণ এখন চাকরির পেছনে না ছুটে কিংবা বেকার বসে না থেকে নিজ গ্রামে ফিরে কৃষিতে ঝুঁকছেন। তারা ইন্টারনেট ঘেঁটে আধুনিক কৃষির নানা কৌশল শিখছেন এবং স্মার্ট কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন। গতানুগতিক ফসলের বাইরে তারা ড্রাগন ফল, মাল্টা, পেয়ারা এবং বিদেশি নানা দামি সবজি চাষ করছেন। এই তরুণদের হাত ধরেই মূলত শৈলকুপার কৃষিতে নতুন নতুন আইডিয়া ও প্রযুক্তির অভাবনীয় ব্যবহার বাড়ছে।
ই-কৃষি এবং সরাসরি বাজারজাতকরণ
ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল এখন কৃষকের হাতের মুঠোয়। শৈলকুপার কৃষকরা এখন ঘরে বসেই স্মার্টফোনের মাধ্যমে নানা ধরনের কৃষি সেবা পাচ্ছেন। ফসলে কোনো অজানা রোগ দেখা দিলে তারা ‘কৃষি বাতায়ন’ বা কল সেন্টারে ফোন করে তাৎক্ষণিক বিশেষজ্ঞের সমাধান পাচ্ছেন। এছাড়া ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রেও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বড় ভূমিকা রাখছে। কৃষকরা এখন ফেসবুক পেজ বা অনলাইনের মাধ্যমে সরাসরি শহরের ক্রেতাদের কাছে তাদের উৎপাদিত নিরাপদ সবজি, খাঁটি মধু বা ফল বিক্রি করতে পারছেন। মাঝখান থেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে যাওয়ায় কৃষকরা এখন পরিশ্রমের আসল লাভের মুখ দেখছেন।
কৃষি বিভাগের ভূমিকা ও সরকারি সহায়তা
শৈলকুপায় কৃষির এই অবিস্মরণীয় আধুনিকায়নের পেছনে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তারা নিয়মিত কৃষকদের উঠান বৈঠক করছেন, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন এবং নতুন প্রযুক্তির সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। সরকার থেকে সাধারণ কৃষকদের বিনামূল্যে সার ও উন্নত বীজ প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার বা কম্বাইন হারভেস্টারের মতো দামি যন্ত্রপাতির ওপর সরকার যে বিশাল ভর্তুকি দিচ্ছে, তা সাধারণ কৃষকদের যান্ত্রিকীকরণের দিকে এগিয়ে যেতে সবচেয়ে বড় সাহস জোগাচ্ছে।
উপসংহার
পরিশেষে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, শৈলকুপায় কৃষি খাতে আধুনিকায়নের যে নতুন হাওয়া বইছে, তা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য এক বিশাল গর্বের বিষয়। যে কৃষক একসময় প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার ওপর নির্ভর করে দিন কাটাতেন, আধুনিক প্রযুক্তি আজ তার হাতে নতুন করে বাঁচার ও স্বপ্ন দেখার হাতিয়ার তুলে দিয়েছে। তবে এই সফল অগ্রযাত্রাকে আরও টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি করতে কিছু বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে শৈলকুপায় উৎপাদিত প্রচুর পেঁয়াজ ও অন্যান্য পচনশীল সবজি সংরক্ষণের জন্য উন্নত মানের হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তির এই ব্যবহার যদি এভাবেই অব্যাহত থাকে এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আরও প্রসারিত হয়, তবে শৈলকুপার কৃষকরা অচিরেই পুরো বাংলাদেশের জন্য এক অনুকরণীয় রোল মডেল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। কৃষকের এই স্বস্তির হাসিমুখই তো একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের আসল প্রতিচ্ছবি।
















