রাজধানীর শাহ আলী মাজারে মধ্যরাতে তাণ্ডব: লাঠিপেটার শিকার সাধারণ ভক্তরা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের মাজারগুলোতে হামলার তালিকায় এবার যুক্ত হলো রাজধানীর মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী শাহ আলী মাজারের নাম। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে একদল যুবক হঠাৎ করে এই মাজারে ঢুকে তাণ্ডব চালায়। তারা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মাজারের ভক্ত ও দর্শনার্থীদের সেখান থেকে বের করে দেয়। হামলার বিভীষিকাময় কিছু ছবি ও ভিডিও রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকেই সারা দেশের মানুষ এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করছেন। কয়েক শ বছরের পুরোনো এই মাজারটি ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে অত্যন্ত পবিত্র একটি স্থান। সেখানে এমন অতর্কিত হামলা সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে অবস্থিত শাহ আলী বোগদাদির মাজারে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতেই বিশাল জলসা বা আসর বসে। রাজধানী ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত মানুষ এই দিনটিতে পীরের টানে মাজারে ছুটে আসেন। বৃহস্পতিবার রাতেও মাজারের পরিবেশ ছিল বেশ উৎসবমুখর। মাজারের পূর্ব পাশে থাকা খালি জায়গায় ভক্তরা মাদুর ও পলিথিন বিছিয়ে গোল হয়ে বসেছিলেন। তাদের পাশেই বিভিন্ন জিনিসপত্রের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন অনেক হকার। রাত যখন ১টা বাজে, ঠিক তখন মুখে সার্জিক্যাল মাস্ক পরা একদল লোক হাতে মোটা লাঠি নিয়ে সেখানে প্রবেশ করে। তারা কোনো কথা না বলেই উপস্থিত মানুষের ওপর বেধড়ক লাঠিপেটা শুরু করে।

হঠাৎ এমন হামলায় ভক্ত ও অনুসারীরা চরম আতঙ্কে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি শুরু করেন। প্রাণ বাঁচাতে অনেকেই মাজারের মূল ফটক দিয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। হামলাকারীরা উপস্থিত সবাইকে পিটিয়ে মাজার প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দেয়। এই হামলায় বেশ কয়েকজন সাধারণ মানুষ গুরুতর আহত হন। রাতের অন্ধকারে এমন হামলায় মাজারের আশপাশের ছোট ব্যবসায়ীদের প্রায় ৫০% পণ্য নষ্ট হয়েছে। পসরা ভেঙে যাওয়ায় অনেক হকারের কয়েক শ ডলার ($) সমপরিমাণ বা কয়েক হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যা এই গরিব মানুষদের একেবারে পথে বসিয়ে দিয়েছে।

এই অতর্কিত হামলার পর থেকেই স্থানীয় মানুষ এবং মাজার জিয়ারতকারীরা সরাসরি জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের দিকে আঙুল তুলছেন। পুলিশ কর্মকর্তারাও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ঠিক একই ধরনের অভিযোগ পেয়েছেন। মিরপুরের যে এলাকায় শাহ আলীর মাজার অবস্থিত, সেটি ঢাকা-১৪ আসনের আওতাধীন। গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মীর আহমদ বিন কাসেম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এলাকার রাজনৈতিক এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে অনেকেই মনে করছেন, হামলাকারীদের পেছনে হয়তো কোনো রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে। পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মো. মোস্তাক সরকার জানান, তারা জানতে পেরেছেন জামায়াত-শিবিরের একটি অংশ এই হামলা চালিয়েছে।

শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি ঘটনার শেষ দিকে সেখানে পৌঁছান। তিনি জানান, বাইরে থেকে আসা কিছু নারী ও পুরুষ মাজারের পাশে মাদুর বিছিয়ে বসেছিলেন। অনেকেই রটিয়েছেন যে সেখানে মাদক সেবনের আসর বসেছিল। কিন্তু ওসি জোর দিয়ে বলেন, শুক্রবার যেখানে জুমার নামাজ পড়া হয়, সেখানে বসে কেউ গাঁজা খায় না। পুলিশ এখন হামলাকারীদের প্রকৃত পরিচয় বের করতে জোরালো তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তবে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি এবং থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক মামলাও দায়ের হয়নি।

এদিকে, জামায়াতে ইসলামী এই হামলায় তাদের দলের কারও জড়িত থাকার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার আমির সেলিম উদ্দিন সংবাদমাধ্যমকে পরিষ্কারভাবে জানান, মাজারের ভক্তদের ওপর জামায়াত বা শিবিরের কর্মীদের হামলা করার কোনো কারণ নেই। তারা এই হামলার সাথে একেবারেই জড়িত নন। রাজনৈতিক দলগুলোর এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মাঝে আসল অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে ঘটা ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে সারা দেশের মাজারগুলোতে হামলার একটি ভীতিকর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’-এর একটি প্রতিবেদন থেকে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। তারা দাবি করেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১৭ মাসের ব্যবধানে সারা দেশে মোট ৯৭টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসব হামলার প্রায় ৭০% থেকে ৮০% ঘটনা ঘটেছে শুধুমাত্র ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে।

মাজারে ধারাবাহিক হামলার এই পরিসংখ্যান সুফি ভক্তদের চরম আতঙ্কিত করে তুলেছে। তারা এখন নিজেদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। শাহ আলী মাজারের মতো একটি সুপরিচিত ও জনবহুল স্থানে এমন হামলা প্রমাণ করে যে, অপরাধীরা আইনের তোয়াক্কা করছে না। সাধারণ মানুষ এখন দাবি করছেন, প্রশাসন যেন দ্রুত সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আসল অপরাধীদের ধরে আইনের আওতায় আনে। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্বাধীনতা রক্ষা করা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। প্রশাসন এখন কঠোর না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও অনেক বেড়ে যেতে পারে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ