মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে প্রথমবারের মতো চীন সফরে গেছেন। এই সফরকে ঘিরে সারা বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যকার সম্পর্ক সব সময়ই বেশ জটিল। এই দুই পরাশক্তির মধ্যে একদিকে যেমন তীব্র প্রতিযোগিতা রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি একে অপরের ওপর গভীর নির্ভরতাও আছে। দুই দেশের মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারের ($৬০০ বিলিয়ন) বিশাল বাণিজ্য হয়। তাই এই দুই দেশের যেকোনো সিদ্ধান্ত সরাসরি পুরো বিশ্বের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
এবারের চীন সফরে বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রযুক্তি, নিরাপত্তা এবং তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে। তবে সব ইস্যুকে ছাপিয়ে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে চলমান ইরান যুদ্ধ। এই যুদ্ধ এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প খুব দ্রুত এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন। দীর্ঘদিনের এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোটাররা এখন চরম বিরক্ত। সামনেই তাদের দেশের মধ্যবর্তী নির্বাচন। নতুন করে এই যুদ্ধের বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা টানতে সে দেশের সাধারণ মানুষ আর মোটেও রাজি নয়। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির কোম্পানিগুলো হয়তো ১০০% লাভবান হচ্ছে, কিন্তু সাধারণ পরিবারের জীবনে মূল্যস্ফীতির মারাত্মক চাপ পড়ছে। তাই ট্রাম্প এখন বিশ্ববাসীকে দেখাতে চান যে, তিনি শুধু যুদ্ধ শুরুই করেন না, বরং যুদ্ধ থামাতেও পারেন।
ঠিক এই জায়গাতেই বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক অনেক বেশি স্থিতিশীল এবং আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বেইজিং কখনো তেহরানের ওপর প্রকাশ্য কোনো চাপ সৃষ্টি করে না, বরং তারা সবসময় সমান মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখে। ফলে ইরানের কাছে চীনের কথার একটি আলাদা গুরুত্ব ও ওজন আছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে একেবারেই নেই। ট্রাম্প খুব ভালো করেই জানেন যে, চীন চাইলে তাদের প্রভাব খাটিয়ে ইরানকে থামিয়ে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চীন কোনোভাবেই এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশ বা কথা মেনে কাজ করবে না। তারা হয়তো আলোচনার একটা সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তবে সেটি তারা করবে সম্পূর্ণ নিজেদের শর্তে। যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করার জন্য নয়, বরং বিশ্বের বৃহত্তর স্থিতিশীলতার স্বার্থে তারা এই কাজ করবে।
ট্রাম্পের এই সফর আসলে বিশ্বমঞ্চে এক ধরনের কঠিন বাস্তবতার নীরব স্বীকারোক্তি। যে যুক্তরাষ্ট্র এত দিন নিজেদের বিশ্বরাজনীতির একক নিয়ন্ত্রক হিসেবে মনে করত, তারাই আজ একটি বড় সংকট মেটাতে চীনের সাহায্য চাইতে বাধ্য হচ্ছে। শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনীতির মাঠেও দুই দেশের মধ্যে একই ধরনের প্রবল দ্বন্দ্ব চলছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন চাইছে চীন যেন তাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজ পদার্থের রপ্তানি সহজ করে দেয়। কারণ, এই বিশেষ খনিজগুলো ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির অস্ত্র, ড্রোন বা স্মার্টফোন তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। আর বিশ্বের প্রায় ৮০% থেকে ৯০% বিরল খনিজ উৎপাদন করে চীন একাই এই বাজারে আধিপত্য ধরে রেখেছে। তাই নিরুপায় হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন চীনের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে।
পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র আরও চাইছে যে, চীন আগের মতোই তাদের কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে কৃষিপণ্য কিনুক। বিশেষ করে সয়াবিন, ভুট্টা এবং শূকরের মাংস কেনার ওপর তারা জোর দিচ্ছে। কিন্তু এখানে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী নীতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারা একদিকে চীনের বিশাল বাজার নিজেদের জন্য খুলে দিতে বলছে, অন্যদিকে ঠিকই নিজেদের দেশে চীনা পণ্য এবং বিনিয়োগের ওপর প্রায় ২৫% থেকে ৫০% পর্যন্ত নানা ধরনের চড়া শুল্ক ও বাধা বসিয়ে রেখেছে। চীন এর কড়া জবাব দিচ্ছে। বেইজিং সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই মুক্তবাণিজ্যে বিশ্বাস করে, তবে তাদের সেটার প্রমাণ দিতে হবে। চীনা পণ্যের ওপর থেকে শুল্কের বাধা কমানো এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ দেওয়ার জোর দাবিই তুলবে চীন।
এই সফরে তাইওয়ান ইস্যুটিও একটি বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। চীন সব সময়ই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, তাইওয়ান তাদের দেশের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং কোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদ তারা কখনোই মেনে নেবে না। এই সফরে চীনের নেতারা চাইবেন, ট্রাম্প যেন প্রকাশ্যে সবার সামনে ঘোষণা দেন যে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে কোনোভাবেই সমর্থন করে না। কিন্তু ট্রাম্পের জন্য এমন কথা বলা মোটেও সহজ কাজ নয়। তিনি এমন কথা বললে নিজের দেশেই কংগ্রেস এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা মহলের তোপের মুখে পড়বেন। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে এমন স্পর্শকাতর প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করবে।
সব কিছু মিলিয়ে ট্রাম্পের এই চীন সফর বিশ্বব্যবস্থায় একটি বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পৃথিবী এখন আর কোনো একক পরাশক্তির হাতে বন্দী নেই। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী প্রভাব ধীরে ধীরে কমছে, কিন্তু চীনও পেশিশক্তি দিয়ে একক আধিপত্য কায়েম করতে চাইছে না। চীন মূলত নিজেকে এমন একটি শক্তি হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছে, যে বিশ্বব্যবস্থার সাথে মিলেমিশে কাজ করতে আগ্রহী। এই এক সফরেই হয়তো সব বাণিজ্য বিরোধ মিটে যাবে না, তাইওয়ান নিয়ে উত্তেজনাও রাতারাতি কমবে না, আর ইরান যুদ্ধও হয়তো এক দিনে থামবে না। তবে ট্রাম্প যদি সত্যি ইরান যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসতে চান, তবে তাঁকে চীনের সাহায্য নিতেই হবে। বর্তমান বিশ্বে পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া যে কোনো বৈশ্বিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়, এই সফর তারই সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প, চীন সফর, ইরান যুদ্ধ, বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য চুক্তি, পরাশক্তি, তাইওয়ান ইস্যু, বিরল খনিজ, মুক্তবাণিজ্য, ভূরাজনীতি
















