নেতানিয়াহুর ‘গোপন সফর’ অস্বীকার করল আমিরাত, ইসরায়েলের মিত্রদের কড়া হুঁশিয়ারি ইরানের

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান ও ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন চরম উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি ‘গোপন সফর’ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। নেতানিয়াহুর দপ্তর দাবি করেছে যে, যুদ্ধ চলাকালে তিনি গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সফর করেছেন। কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এই দাবি সরাসরি ও কঠোর ভাষায় নাকচ করে দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল, আমিরাত এবং ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক অস্থিরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের (পিএমও) দেওয়া একটি চাঞ্চল্যকর বিবৃতি থেকে। বিবৃতিতে দাবি করা হয়, লিকুদ পার্টির শীর্ষ নেতা ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সামরিক যোগাযোগ ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করতে গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যান। এই গোপন সফরের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, এই সফরে নেতানিয়াহু সরাসরি আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন। পিএমওর বিবৃতিতে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলা হয়, নেতানিয়াহুর এই সফরের ফলে ইসরায়েল ও আমিরাতের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘ঐতিহাসিক অগ্রগতি’ ও বড় ধরনের মাইলফলক তৈরি হয়েছে।

ইসরায়েলের এমন বড় দাবির পরপরই সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি আনুষ্ঠানিক ও কড়া বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। আমিরাত সরকার নেতানিয়াহুর এই দাবিকে সম্পূর্ণ ‘ভিত্তিহীন’ ও মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলা হয়, “সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্ববাসীকে পরিষ্কারভাবে জানাচ্ছে যে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আমিরাত সফরের যে খবর ছড়ানো হচ্ছে তা একেবারেই সঠিক নয়। এছাড়া দেশে কোনো ধরনের ইসরায়েলি সামরিক প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানানোর খবরটিও মিথ্যা।” আমিরাত আরও মনে করিয়ে দেয় যে, ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের যেকোনো সম্পর্ক সম্পূর্ণ প্রকাশ্য এবং তা ২০২০ সালে দাপ্তরিকভাবে ঘোষিত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ চুক্তির নির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয়। এর বাইরে গিয়ে অস্বচ্ছ, অঘোষিত বা অনানুষ্ঠানিক কোনো গোপন চুক্তির ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক চালানোর কোনো প্রশ্নই আসে না।

তবে আমিরাতের এই অস্বীকারের মাঝেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স একটি ভিন্ন খবর প্রকাশ করে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়, গত ২৬ মার্চ নেতানিয়াহু এবং শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের (এমবিজেড) মধ্যে সত্যি সত্যিই একটি গোপন সাক্ষাৎ হয়েছিল। মূলত ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাঝে সামরিক পদক্ষেপগুলো কীভাবে সমন্বয় করা যায়, সেটি নিয়েই তারা বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন। নেতানিয়াহুর দপ্তরের করা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের পরপরই রয়টার্স তাদের এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে, যা পুরো ঘটনাটিকে আরও বেশি রহস্যময় করে তুলেছে।

নেতানিয়াহুর দপ্তরের এই দাবি এমন এক সংবেদনশীল সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি আরেকটি বড় তথ্য ফাঁস করেছেন। তিনি প্রকাশ করেন যে, ইরান যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য ইসরায়েল অত্যন্ত গোপনে তাদের অত্যাধুনিক ‘আয়রন ডোম’ ইন্টারসেপশন সিস্টেমের কয়েকটি ব্যাটারি আমিরাতে পাঠিয়েছিল। প্রতিটি আয়রন ডোম মিসাইলের দাম প্রায় ৫০,০০০ ডলার ($৫০,০০০), যা শত্রুর রকেট আকাশে থাকা অবস্থাতেই ধ্বংস করতে পারে। এই তথ্য প্রমাণ করে যে, প্রকাশ্যে আমিরাত যতই অস্বীকার করুক না কেন, পর্দার আড়ালে ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের বড় ধরনের সামরিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই ভয়ংকর যুদ্ধ শুরু হয়। মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর সরাসরি হামলা এবং ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বিভিন্ন মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিতে বৃষ্টির মতো ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত যেহেতু মার্কিন বাহিনীর একটি বড় ঘাঁটি, তাই তারা প্রথম দিকেই এই ইরানি হামলার বড় ধরনের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল।

এদিকে, ইসরায়েলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর এই গোপন যোগাযোগের খবরে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছে ইরান। তারা ইসরায়েলের সঙ্গে ‘আঁতাত’ করা দেশগুলোকে চরম মূল্য চোকাতে হবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইরানের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি কড়া পোস্ট দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে যুদ্ধের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের যে দাবি করা হয়েছে, তার মাধ্যমে নেতানিয়াহু এখন প্রকাশ্যে সেটাই উন্মোচন করেছেন, যা আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনেক আগেই আমাদের শীর্ষ নেতৃত্বকে জানিয়েছিল।”

আরাগচি তার পোস্টে আরব দেশগুলোকে সতর্ক করে আরও লেখেন, “ইরানের মহান জনগণের সঙ্গে শত্রুতা করা যেকোনো দেশের জন্যই একটি বোকামিপূর্ণ জুয়া। আর এই কাজে ইসরায়েলের মতো শত্রুর সঙ্গে আঁতাত করা আমাদের কাছে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। যারা মধ্যপ্রাচ্যে বিভাজন সৃষ্টির লক্ষ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে, তাদের অবশ্যই একদিন আমাদের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।” ইরানের এই হুমকির পর মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য আরব দেশগুলোও এখন চরম অস্বস্তিতে পড়েছে। কারণ, এই যুদ্ধ যদি আরও সম্প্রসারিত হয়, তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি, বিশেষ করে তেলের বাজার বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ