প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শির্ক্ষাথীদের যে রুটি ,ডিম ও দুধ দেয় তা খেয়ে বাচ্ছাদের বাড়ির খাবারের প্রতি আগ্রহ থাকছেনা,ফলে উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি হচ্ছে, দাবি অনেক অবিভাবকের

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email


শিশুদের শিক্ষার ভীত মজবুত করতে এবং তাদের স্কুলমুখী করার জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে। এর মধ্যে অন্যতম একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ হলো শিশুদের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর জন্য টিফিন বা মিড-ডে মিল হিসেবে খাবার সরবরাহ করা। বর্তমানে অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন রুটি, একটি সেদ্ধ ডিম ও দুধ দেওয়া হচ্ছে। শুরুতে এই উদ্যোগটি সব মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য এটি সত্যিই একটি আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এই কর্মসূচির একটি ভিন্ন ও নেতিবাচক দিক ধীরে ধীরে সামনে আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে অনেক সচেতন অভিভাবক এখন অভিযোগ করছেন যে, স্কুলের এই ভারী খাবার খেয়ে তাদের বাচ্চারা বাড়ির স্বাভাবিক এবং বৈচিত্র্যময় খাবারের প্রতি একদমই আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। স্কুল থেকে দেওয়া রুটি, ডিম ও দুধ খেয়ে বাচ্চাদের পেট এতটাই ভরা থাকছে যে, তারা বাড়িতে এসে ভাত, মাছ, ডাল বা শাকসবজি আর খেতে চাইছে না। ফলে অনেক অভিভাবক গভীরভাবে মনে করছেন, এই উদ্যোগের ফলে দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হচ্ছে।

স্কুল ফিডিং কর্মসূচির মহৎ উদ্দেশ্য বনাম বাস্তব পরিস্থিতি
যেকোনো সরকারি উদ্যোগের পেছনে একটি মহৎ উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই খাবার দেওয়ার মূল লক্ষ্য ছিল শিশুদের উপস্থিতি বাড়ানো এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করা। আমাদের দেশের অনেক শিশু সঠিক পুষ্টি পায় না, তাই তাদের কথা চিন্তা করেই এই পুষ্টিকর খাবারগুলো নির্বাচন করা হয়েছে। ডিম ও দুধ অবশ্যই আদর্শ এবং পুষ্টিকর খাবার। কিন্তু সমস্যাটি তৈরি হয়েছে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায়। প্রতিদিন একইভাবে একই ধরনের ভারী খাবার খাওয়ার ফলে বাচ্চাদের খাদ্যাভ্যাসে একটি বড় রকমের পরিবর্তন আসছে। স্কুলে পেটপুরে খাওয়ার পর তাদের ক্ষুধা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা বর্তমান পরিস্থিতির একটি বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পেট অতিরিক্ত ভরা থাকার কারণে বাড়ির খাবারে তীব্র অনীহা
একটি ছোট শিশুর পাকস্থলী বা হজমশক্তি একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মতো বড় হয় না। খুব সামান্য খাবারেই তাদের পেট ভরে যায়। স্কুলে যখন একটি বাচ্চা একটি আস্ত সেদ্ধ ডিম, এক প্যাকেট দুধ এবং একটি রুটি খায়, তখন তার পেট দীর্ঘ সময়ের জন্য ভারী হয়ে থাকে। ডিম এবং দুধ দুটোই উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ এবং ভারী খাবার। এগুলো হজম হতে বেশ অনেকটা সময় লাগে। ফলে স্কুল ছুটি হওয়ার পর দুপুরে যখন বাচ্চাটি বাড়িতে ফেরে, তখন তার আর দুপুরের ভাত খাওয়ার মতো বিন্দুমাত্র ক্ষুধা থাকে না। মায়েরা পরম যত্নে ভাত, ডাল, মাছ বা মাংস রান্না করে বসে থাকেন, কিন্তু বাচ্চা তা মুখেও তুলতে চায় না। জোর করলে কান্নাকাটি করে বা অনেক সময় বমি করে দেয়।

একঘেয়ে খাদ্যাভ্যাস এবং সুষম পুষ্টির মারাত্মক ঘাটতি
ডিম এবং দুধ পুষ্টির দারুণ উৎস হলেও, শুধু এই দুটি খাবারই একটি শিশুর শরীরের সমস্ত পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পারে না। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সম্পূর্ণ বিকাশের জন্য শর্করা, ভিটামিন, আয়রন ও নানা রকম খনিজ উপাদান প্রয়োজন। এগুলো মূলত দেশি শাকসবজি, ছোট মাছ, ডাল ও ভাতের মতো সাধারণ খাবার থেকে আসে। কিন্তু বাচ্চারা যখন বাড়ির এসব সাধারণ খাবার দিনের পর দিন এড়িয়ে চলে, তখন তাদের শরীরে সুষম পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে। প্রতিদিন কেবল রুটি, ডিম ও দুধ খাওয়ার কারণে তাদের খাদ্যাভ্যাস একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে এবং তারা অন্যান্য সবজির পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

মায়ের হাতের রান্নার প্রতি আকর্ষণ কমে যাওয়ার শঙ্কা
বাঙালি পারিবারিক সংস্কৃতির একটি বড় সৌন্দর্য হলো সবাই মিলে একসাথে বসে খাবার খাওয়া। মায়ের হাতের রান্না করা খাবার খেয়েই আমাদের দেশের শিশুরা বড় হয়, এর সাথে জড়িয়ে থাকে আবেগ ও ভালোবাসা। কিন্তু বর্তমান এই পরিস্থিতির কারণে বাচ্চারা মায়ের হাতের রান্নার প্রতি ধীরে ধীরে আকর্ষণ হারিয়ে ফেলছে। অনেক অভিভাবক আক্ষেপ করে বলছেন, আগে বাচ্চারা স্কুল থেকে ফিরে ক্ষুধায় অস্থির হয়ে ভাত চাইত, মায়ের রান্নার প্রশংসা করত। এখন তারা বাড়িতে এসে খাবার দেখলেই বিরক্ত হয়। এতে শিশু এবং পরিবারের মধ্যে খাদ্যাভ্যাসগত একটি দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।

হজমের সমস্যা, শারীরিক অস্বস্তি ও গ্যাস্ট্রিকের প্রকোপ
সব শিশুর শারীরিক গঠন এবং হজমশক্তি এক রকম হয় না। অনেক অভিভাবকের জোরালো দাবি, প্রতিদিন ভারী ডিম, দুধ ও রুটি খাওয়ার কারণে অনেক শিশুর গ্যাস্ট্রিক বা বদহজমের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অনেকের আবার দুধে অ্যালার্জি বা ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকে। বিশেষ করে গরমের দিনে রুটি, ডিম ও দুধ একসাথে খেলে অনেকেরই পেট ফেঁপে যায়, গ্যাস হয় বা অস্বস্তি বোধ হয়। এর ফলে বাচ্চার ক্ষুধা একেবারে মরে যায়। দীর্ঘদিন ধরে এমন হজমের গোলমাল চলতে থাকলে শিশুর লিভার ও পাকস্থলীর স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে বলে অনেক অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

মানসিক চাপ ও পরিবারে তৈরি হওয়া অশান্তি
বাচ্চারা বাড়িতে ঠিকমতো না খেলে সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপে পড়েন মায়েরা। বাচ্চা কেন খাচ্ছে না, তার শরীর খারাপ হবে কি না—এই চিন্তায় মায়েরা সারাক্ষণ উদ্বিগ্ন থাকেন। বাচ্চাকে জোর করে খাওয়াতে গিয়ে প্রায়ই মা ও শিশুর মধ্যে এক ধরনের মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। বাচ্চা রেগে যায়, কান্নাকাটি করে, আর মায়েরাও মেজাজ হারিয়ে ফেলেন। একটি সামান্য খাবার দেওয়ার সরকারি কর্মসূচি পরোক্ষভাবে অনেক পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের শান্তিতে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, যা মোটেও কাম্য নয়।

দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাস্তবতার দৃশ্যপট
অবশ্যই এই কর্মসূচির একটি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক আছে। যেসব হতদরিদ্র পরিবারের শিশুদের তিন বেলা ঠিকমতো পুষ্টিকর খাবার জোটে না, তাদের জন্য স্কুলের এই খাবার সত্যি জীবন রক্ষাকারী। কিন্তু গ্রামের সাধারণ বা মধ্যবিত্ত পরিবারের চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। এসব পরিবারে হয়তো প্রতিদিন দামি খাবার থাকে না, কিন্তু ভাত, ডাল, সবজি বা সাধারণ মাছ-ডিমের কোনো অভাব নেই। মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকরাই মূলত এই অভিযোগটি বেশি করছেন। তারা চান তাদের সন্তান বাড়ির তৈরি সতেজ ও গরম খাবার নিয়মিত খাক। তাই সব শ্রেণির শিশুর জন্য প্রতিদিন একই নিয়মে একই পরিমাণ ভারী খাবার দেওয়াটা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

সমস্যার সমাধানে সময়োপযোগী বিকল্প করণীয়
অভিভাবকদের এই উদ্বেগ ও দাবিগুলো একেবারেই উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। সরকারকে এই কর্মসূচির নিয়মে কিছুটা পরিবর্তন ও নমনীয়তা আনার কথা গুরুত্বের সাথে ভাবতে হবে। প্রতিদিন ভারী খাবারের বদলে খাবারের ধরনে বৈচিত্র্য আনা যেতে পারে। যেমন, সপ্তাহে দু-একদিন কলা, পেয়ারা বা পেঁপের মতো দেশি সতেজ ফল দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া খাবার দেওয়ার সময়সূচিতেও পরিবর্তন আনা যেতে পারে। ছুটির ঠিক আগে আগে খাবার না দিয়ে, স্কুলের মাঝামাঝি সময়ে দিলে বাড়ি ফেরার পর তাদের স্বাভাবিক ক্ষুধা ফিরে আসতে পারে। প্রয়োজনে স্থানীয় অভিভাবকদের মতামত নিয়ে মেন্যু ঠিক করা যেতে পারে।

উপসংহার
পরিশেষে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে সরকারের এই খাবার দেওয়ার উদ্যোগটি একটি চমৎকার ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু এই উদ্যোগের ফলে শিশুদের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস যদি নষ্ট হয়ে যায় এবং বাড়ির পুষ্টিকর খাবারের প্রতি তাদের অনীহা তৈরি হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে উপকারের বদলে ক্ষতির কারণই হয়ে দাঁড়াবে। ডিম, দুধ ও রুটি শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো হলেও তা যেন কোনোভাবেই তাদের দুপুরের মূল খাবার বা ভাতের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে নিবিড় খেয়াল রাখা জরুরি। অভিভাবকদের দাবিগুলো ও বাস্তব পরিস্থিতি সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করে কর্মসূচিতে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা উচিত। তবেই এই মহৎ উদ্যোগটি তার প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে গড়ে উঠবে।



সম্পর্কিত নিবন্ধ