বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এখন থেকে আর কোনো নতজানু আচরণের জায়গা নেই। ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের যে নতুন পাঁয়তারা শুরু হয়েছে, তাতে বাংলাদেশ সরকার বা দেশের সাধারণ মানুষ মোটেও ভয় পায় না। সোমবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এই কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমান বাংলাদেশ আর অতীতের সেই দুর্বল বা নীরব বাংলাদেশ নেই। নিজেদের সীমান্ত, দেশের মানুষের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়ে সরকারের ১০০% নিজস্ব পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি রয়েছে। কেউ চাইলেই এখন আর বাংলাদেশকে চোখ রাঙাতে পারবে না।
সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। সেখানে নতুন সরকার গঠন করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি। ক্ষমতায় বসেই পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দিয়েছেন যে, বাংলাদেশ-ভারত আন্তর্জাতিক সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কাছে প্রয়োজনীয় জমি বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সোমবার হাওড়ায় রাজ্য সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের পরই তিনি এই ঘোষণা দেন। এ কাজের জন্য তিনি রাজ্যের মুখ্য সচিব ও ভূমি রাজস্বসচিবকে বিশেষ দায়িত্বও দিয়েছেন। শুভেন্দু অধিকারীর এই ঘোষণার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, কাঁটাতার দিয়ে এখন আর বাংলাদেশকে ডর বা ভয় দেখানোর কোনো সুযোগ নেই।
উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের এই চড়া ঘোষণাকে অনেকটা নির্বাচনী উত্তাপের রেশ হিসেবেই দেখছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় মানুষের ভোট টানার জন্য নেতারা অনেক সময় উগ্র বা অশোভন কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে একটি সরকার চালানো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। তিনি মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের কথা ও কাজের মধ্যে কতটা মিল থাকে, তা দেখার জন্য আমাদের আরও কিছুটা সময় দেওয়া দরকার। বাংলাদেশ সব সময় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক বজায় রাখে। তাই প্রতিবেশী দেশের কোনো রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কাদায় বাংলাদেশ অযথাই জড়াতে চায় না। তবে যেখানে আমাদের শক্ত কথা বলা দরকার, সেখানে আমরা কথা বলব, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ০% ছাড় দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ সব সময় এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়। তবে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে বর্তমানে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। হুমায়ুন কবির স্মরণ করিয়ে দেন, দেশের প্রায় ১৫০০ সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে পালিয়ে যাওয়া এক প্রমাণিত সন্ত্রাসী এখন ভারতের মাটিতে আশ্রয় নিয়ে আছে। ভারতের মতো একটি বৃহৎ ও সার্বভৌম দেশে বসে সে যেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করার সুযোগ না পায়, সেটা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। ভারত সরকার ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছে যে, তারা হাসিনাকে ভারত থেকে কোনো ষড়যন্ত্র করার সুযোগ দেবে না।
দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে যদি সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আন্তরিক অঙ্গীকার থাকে, তবে যেকোনো কঠিন সমস্যারই সমাধান সম্ভব। হুমায়ুন কবির বলেন, সংলাপের দরজা সব সময় খোলা আছে। কিছু সমস্যার সমাধান হয়তো খুব দ্রুত হবে, আবার কিছু ক্ষেত্রে হয়তো বেশ সময় লাগবে। তবে দুই পক্ষ আন্তরিক হলে কোনো সংকটই স্থায়ী হতে পারে না।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের আক্ষেপ তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এত দিন বলে আসছিল যে, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চরম আপত্তির কারণেই তিস্তা চুক্তি সই করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার এবং দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার—উভয় জায়গাতেই একই দল বিজেপি ক্ষমতায় রয়েছে। তাই হুমায়ুন কবির আশা প্রকাশ করেন, তিস্তা নিয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এগিয়ে নিতে এখন আর আগের মতো কোনো বড় রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা থাকবে না।
ভারত যখন তিস্তা চুক্তি নিয়ে কালক্ষেপণ করেছে, তখন বাংলাদেশ হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। নিজস্ব অর্থে ও বিদেশি সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই প্রকল্পে চীনের আর্থিক সহায়তার বিষয়টি এখন অনেকটাই চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। হুমায়ুন কবির জানান, চীনের স্বনামধন্য এক্সিম ব্যাংক এই মেগা প্রকল্পে অর্থায়ন করতে রাজি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের প্রাথমিক ধারণা, এই বিশাল প্রকল্পের জন্য প্রায় ১ বিলিয়ন $ (ডলার) বা তারও বেশি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। এই বিপুল বিনিয়োগ দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষিব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে এবং ফসলের উৎপাদন অন্তত ৩০% বাড়িয়ে দেবে। বর্তমানে প্রকল্পের সমীক্ষা প্রতিবেদনের সুপারিশ নিয়ে কাজ চলছে এবং খুব শিগগিরই বিস্তারিত আলোচনা শেষে মূল কাজ শুরু হবে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি উল্লেখ করেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানই চীনের সঙ্গে এই ঐতিহাসিক সম্পর্কের মজবুত ভিত রচনা করেছিলেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার উদ্যোগ নিয়েছে। চীনও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে ব্যাপকভাবে আগ্রহী। যদিও প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে খুব শিগগিরই দুই দেশের সুবিধাজনক একটি সময়ে তিনি বেইজিং সফর করবেন। এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও মজবুত হবে।
















