ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা চালানোর জন্য ইরাকের মরুভূমিতে গোপনে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছিল ইসরায়েল। এমনকি নিজেদের এই গোপন ঘাঁটির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং তথ্য ফাঁস হওয়া ঠেকাতে তারা ইরাকি সেনাদের ওপর সরাসরি বিমান হামলাও চালিয়েছিল। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ইরানের দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ এখন যে এক নতুন মাত্রা পেয়েছে, এই প্রতিবেদন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু করার ঠিক আগে ইরাকের মরুভূমিতে এই গোপন ঘাঁটিটি গড়ে তুলেছিল ইসরায়েল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ঘাঁটি নির্মাণের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের আগে থেকেই জানা ছিল। মূলত এটি ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর একটি লজিস্টিক হাব বা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এই ঘাঁটিতে ইসরায়েলি স্পেশাল ফোর্সের প্রশিক্ষিত সদস্যরা অত্যন্ত গোপনে অবস্থান করতেন। ইরান যুদ্ধের সময় যদি কোনো কারণে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয় এবং কোনো পাইলট বিপদে পড়েন, তবে তাদের দ্রুত অনুসন্ধান ও উদ্ধার করার জন্য সেখানে বিশেষ ‘সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ টিম’ মোতায়েন করা হয়েছিল। তবে সৌভাগ্যবশত, যুদ্ধে এমন কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।
এই গোপন ঘাঁটির অবস্থান সম্পর্কে প্রথমে ধারণা পায় ইরাকের এক স্থানীয় রাখাল। গত মার্চ মাসের শুরুর দিকে ওই রাখাল ইরাকের বিশাল মরুভূমিতে হেলিকপ্টার চলাচলসহ অস্বাভাবিক সামরিক কার্যকলাপ দেখতে পেয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জানান। তার তথ্যের ভিত্তিতে ইরাকি সেনাবাহিনীর একটি দল ‘হামভি’ সামরিক যান নিয়ে মরুভূমিতে তদন্তে যায়। কিন্তু তারা ঘাঁটির কাছাকাছি পৌঁছাতেই তীব্র গুলিবর্ষণের মুখে পড়ে। এই হামলায় একজন ইরাকি সেনা প্রাণ হারান এবং আরও দুজন আহত হন। প্রথম দলটি আক্রান্ত হওয়ার পর ইরাকের কাউন্টার টেররিজম সার্ভিসের আরও দুটি ইউনিট সেখানে পাঠানো হয়। অনুসন্ধানে তারা ওই এলাকায় বিদেশি সামরিক বাহিনীর উপস্থিতির স্পষ্ট প্রমাণ পায়।
ইরাক সরকার প্রাথমিকভাবে এই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছিল এবং মার্চ মাসেই জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানিয়েছিল। ইরাকের জয়েন্ট অপারেশনস কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল কাইস আল-মুহাম্মাদাওয়ি দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, এই বেপরোয়া অভিযানটি বাগদাদ সরকারের কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই চালানো হয়েছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্র জড়িত ছিল না; বরং ইসরায়েল নিজেদের ঘাঁটির গোপনীয়তা বজায় রাখতেই এই হামলা চালিয়েছিল। ইসরায়েলের সেনাবাহিনী এই ঘটনার বিষয়ে গণমাধ্যমে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
ইসরায়েল থেকে ইরানের দূরত্ব প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটারের বেশি। এই বিশাল দূরত্ব পাড়ি দিয়ে টানা পাঁচ সপ্তাহের বিমান অভিযানে এই গোপন ঘাঁটিটি ইসরায়েলি বাহিনীকে অভাবনীয় সামরিক সুবিধা দিয়েছে। তবে এই ঘটনা ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্ব কীভাবে একটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এতে জড়িয়ে ফেলেছে, তা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশ্ন তুলেছে। মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞরা জানান, যুদ্ধের আগে এ ধরনের অস্থায়ী ফ্রন্ট-অপারেটিং বেস তৈরি করা সামরিক কৌশলের একটি অংশ। ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলীয় মরুভূমি বিশাল ও জনবসতিহীন হওয়ায় এটি এ ধরনের গোপন ঘাঁটি স্থাপনের জন্য একটি আদর্শ জায়গা।
এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। গত মার্চ মাসে পদত্যাগ করা মার্কিন সাবেক কাউন্টার টেররিজম প্রধান জো কেন্ট অভিযোগ করেছেন যে, ইসরায়েলের কারণে যুক্তরাষ্ট্র অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতেই সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে টেনে এনেছেন এমন ধারণা পুরোপুরি ভুল।
















