ঝিনাইদহের কৃষিপণ্যে বাজারমূল্য বৃদ্ধিতে কৃষকের স্বস্তি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশ মূলত একটি কৃষিনির্ভর দেশ। এ দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী চালিকাশক্তি হলো কৃষি। আর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শান্ত ও ছিমছাম জেলা ঝিনাইদহ কৃষিক্ষেত্রে সবসময়ই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাম। এখানকার উর্বর মাটি, বিস্তীর্ণ মাঠ আর অনুকূল আবহাওয়া নানা ধরনের ফসল ফলানোর জন্য বেশ উপযোগী। তবে আমাদের দেশের কৃষকদের সবচেয়ে বড় আক্ষেপের জায়গা ছিল তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া। হাড়ভাঙা খাটুনি আর রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ফসল ফলানোর পর যখন বাজারে গিয়ে উপযুক্ত দাম পাওয়া যেত না, তখন কৃষকের চোখে জল আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই জুটত না। তবে অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হলো, বর্তমান সময়ে ঝিনাইদহের কৃষিপণ্যের বাজারমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানকার সাধারণ কৃষকদের মাঝে এক বিশাল স্বস্তি ফিরে এসেছে। দীর্ঘদিনের হতাশা কাটিয়ে কৃষকের মুখে যে তৃপ্তির হাসি ফুটেছে, তা আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য দারুণ এক ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কৃষিনির্ভর ঝিনাইদহের চিরচেনা রূপ

ঝিনাইদহ জেলার দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠগুলোর দিকে তাকালে যে কারও চোখ জুড়িয়ে যায়। ধান, পাট, আখ থেকে শুরু করে সবজি, পান এবং নানা ধরনের ফলের ব্যাপক চাষ হয় এই জেলায়। বিশেষ করে কালীগঞ্জ, কোটচাঁদপুর, মহেশপুর, শৈলকুপা, হরিণাকুণ্ডু ও সদর উপজেলার কৃষকেরা সারা বছরই মাঠে কোনো না কোনো ফসল নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। কাকডাকা ভোরে লাঙল-জোয়াল বা পাওয়ার টিলার নিয়ে মাঠে যাওয়া এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘাম ঝরানো—এটাই এখানকার গ্রামীণ মানুষের চিরচেনা জীবন। কৃষকের এই অক্লান্ত পরিশ্রম আর মাটির প্রতি ভালোবাসার কারণেই প্রতিদিন সারা দেশের লাখো মানুষের প্লেটে সতেজ খাবার পৌঁছায়। ঝিনাইদহের গ্রামীণ জীবন আর কৃষি যেন একে অপরের পরিপূরক।

অতীতের হতাশা: ঘামে ভেজা ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন আমরা খবরে দেখেছি ঝিনাইদহের কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত টমেটো, বাঁধাকপি বা বেগুন খেতেই পচতে দিচ্ছেন বা রাস্তায় ফেলে যাচ্ছেন। কারণ, বাজারদর এতই কম ছিল যে খেত থেকে ফসল তুলে ভ্যান বা ট্রাকে করে বাজারে নেওয়ার পরিবহন খরচটুকুও উঠত না। মনের দুঃখে রাস্তায় দুধ ঢেলে বা হাইওয়েতে ফসল ফেলে প্রতিবাদ করার দৃশ্যও আমরা দেখেছি। ব্যাংক বা এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সার ও বীজ কিনে চাষাবাদ করার পর এমন লোকসান কৃষকদের মেরুদণ্ড একেবারে ভেঙে দিত। কিস্তি শোধ করতে গিয়ে অনেক কৃষককে ভিটেমাটি বা হালের বলদ পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। এই সীমাহীন হতাশা তরুণদের কৃষিকাজের প্রতি আগ্রহ একদম কমিয়ে দিচ্ছিল।

বর্তমান বাজারের চিত্র: দাম বৃদ্ধিতে কৃষকের মুখে হাসি

আশার কথা হলো, এবার ঝিনাইদহের কৃষিপণ্যের বাজারে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আনন্দদায়ক চিত্র দেখা যাচ্ছে। বেশ কিছুদিন ধরে ধান, গম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন রবিশস্য এবং সবজির বাজারদর বেশ ভালো যাচ্ছে। বাজারে কৃষিপণ্যের দাম কিছুটা বাড়ায় কৃষকরা তাদের ঘাম ও শ্রমের সঠিক মূল্য পাচ্ছেন। এখন স্থানীয় বাজারগুলোতে এক মণ ধান বা এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে কৃষক বেশ ভালো অঙ্কের লাভ ঘরে তুলতে পারছেন। এই লাভ তাদের শুধু সংসারের নিত্যদিনের অভাবই ঘোচাচ্ছে না, বরং আগামী দিনে আরও বড় পরিসরে চাষাবাদ করার জন্য নতুন করে সাহস ও উৎসাহ জোগাচ্ছে। পরিবারের সবার মুখে দু’মুঠো ভালো খাবার তুলে দেওয়া এবং ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার খরচ জোগানোর যে নিত্য দুশ্চিন্তা ছিল, তা এখন কৃষকের মন থেকে অনেকটাই দূর হয়েছে।

সবজি ও অন্যান্য ফসলের ভালো দাম

ঝিনাইদহ জেলা নিরাপদ ও সতেজ সবজি উৎপাদনের জন্য সারা দেশেই বিখ্যাত। এখানকার উৎপাদিত কাঁচামরিচ, বেগুন, পটল, করলা, শিম ও শসা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় শহরের বাজারে যায়। বর্তমানে বাজারে এই সবজিগুলোর বেশ ভালো দাম রয়েছে। শীতকালীন বা গ্রীষ্মকালীন—যেকোনো মৌসুমের সবজি চাষিরাই এবার ভালো দাম পেয়ে দারুণ খুশি। পাশাপাশি পেঁয়াজ, রসুন ও ডালজাতীয় ফসলের দামও এবার কৃষকদের সম্পূর্ণ অনুকূলে রয়েছে। এছাড়া আধুনিক কৃষির ছোঁয়ায় ড্রাগন, পেয়ারা, বাউকুল ও মাল্টা চাষিরাও এখন বাগান থেকেই ভালো দামে পাইকারদের কাছে ফল বিক্রি করতে পারছেন। ফসলের এই ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন ও শক্তিশালী গতির সঞ্চার করেছে।

মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য হ্রাস ও সরাসরি বিক্রি

কৃষকের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল মধ্যস্বত্বভোগী, দালাল বা ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য। কৃষকের কাছ থেকে পানির দরে ফসল কিনে তারা শহরে গিয়ে চড়া দামে বিক্রি করত। ফলে শহরের ভোক্তা বেশি দাম দিলেও গ্রামের আসল কৃষক বঞ্চিত হতেন। তবে এখন ঝিনাইদহের কৃষকদের মাঝে সচেতনতা অনেক বেড়েছে। তারা এখন হাতে থাকা স্মার্টফোনের মাধ্যমেই বাজারের আসল দরদাম জানতে পারছেন। অনেক কৃষক এখন ফড়িয়াদের এড়িয়ে সরাসরি আড়তে বা বড় পাইকারের কাছে নিজেদের ফসল বিক্রি করছেন। ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে অনেক তরুণ ও শিক্ষিত কৃষি উদ্যোক্তা সরাসরি শহরের ক্রেতাদের কাছেও প্যাকেটজাত পণ্য পাঠাচ্ছেন। এতে মাঝখানের দালালদের প্রভাব অনেকটাই কমে এসেছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিকতার সুফল

কৃষিপণ্যের দাম ভালো পাওয়ার পেছনে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি বিশাল অবদান রয়েছে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু চালুর পর ঝিনাইদহ থেকে ট্রাকে করে খুব অল্প সময়ে তাজা কাঁচামাল ঢাকায় পৌঁছে যাচ্ছে। আগে ফেরিঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকে পচনশীল সবজি ট্রাকেই নষ্ট হয়ে যেত, যার পুরো দায়ভার ও ক্ষতি বহন করতে হতো অসহায় কৃষককে। এখন সেই ভয় আর নেই। সকালে খেত থেকে তোলা তাজা সবজি বিকেলের মধ্যেই ঢাকার বাজারে চলে যাচ্ছে। পরিবহন ব্যবস্থা সহজ ও দ্রুত হওয়ায় দূর-দূরান্তের পাইকাররা সরাসরি ঝিনাইদহের গ্রামে গ্রামে এসে ফসল কিনছেন, যা কৃষকদের কোনো ঝামেলা ছাড়াই ভালো দাম নিশ্চিত করছে।

কৃষি উপকরণের মূল্য ও কৃষকের প্রত্যাশা

কৃষিপণ্যের দাম বাড়ায় কৃষকের মনে স্বস্তি এলেও, কিছু শঙ্কা এখনো রয়েই গেছে। কারণ, ফসলের দাম বাড়ার সাথে সাথে সার, কীটনাশক, বীজ, ট্রাক্টর ভাড়া এবং সেচের খরচও আগের চেয়ে অনেকটা বেড়ে গেছে। অনেক সময় ভরা মৌসুমে অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজারে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের কাছ থেকে বেশি দাম আদায় করে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়লে তা যদি উৎপাদন খরচের চেয়ে বেশি না হয়, তবে দিন শেষে কৃষকের পকেট শূন্যই থেকে যাবে। তাই সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনকে বাজারের দিকে কড়া নজর রাখতে হবে, যেন কৃষি উপকরণের দাম সবসময় কৃষকের নাগালের মধ্যে থাকে এবং তারা যেন কোনোভাবেই প্রতারিত না হন।

উপসংহার

পরিশেষে নির্দ্বিধায় বলা যায়, ঝিনাইদহের কৃষকদের চোখেমুখে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যে স্বস্তির হাসি ফুটেছে, তা সত্যিই পুরো দেশের জন্যই একটি আনন্দের খবর। একজন কৃষক যখন তার হাড়ভাঙা পরিশ্রমে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান, তখন কেবল একটি পরিবারই বাঁচে না, বরং আমাদের দেশের পুরো অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। কৃষকের পকেটে টাকা থাকলে স্থানীয় বাজারগুলোতেও কেনাবেচা বাড়ে। তবে কৃষকের এই স্বস্তি যেন কেবল এক বা দুই মৌসুমের জন্য সাময়িক না হয়, সেদিকে আমাদের নজর দিতে হবে। এলাকায় পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার স্থাপন করা হলে কৃষকরা তাদের অতিরিক্ত ফসল সংরক্ষণ করে অসময়ে আরও বেশি লাভবান হতে পারবেন। “কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ”—এই সত্যকে বুকে ধারণ করে কৃষকের এই হাসিমুখ ধরে রাখতে সরকার, প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। কৃষকের ঘামের প্রকৃত মূল্যায়ন হলেই আমাদের দেশ সত্যিকারের স্বনির্ভরতা ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে।


সম্পর্কিত নিবন্ধ