ঝিনাইদহ জেলার অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল উপজেলা হলো শৈলকুপা। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন এই উপজেলার সাধারণ মানুষকে যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি সেবার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। একটা সামান্য কাগজ বা সনদের জন্য মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে বা শহরের অফিসে ছুটতে হতো। কিন্তু সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে শৈলকুপার চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমান যুগে ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা আগের চেয়ে অনেক সহজ ও স্বস্তিদায়ক হয়েছে। শৈলকুপায় ডিজিটাল সেবার প্রসার ঘটার ফলে জনগণের ভোগান্তি যে কতটা দ্রুত কমছে, তা এখন এই এলাকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দিকে তাকালেই খুব সহজে বোঝা যায়।
ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের জাদুকরী ভূমিকা
গ্রামের মানুষের ভোগান্তি কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিপ্লবটি এনেছে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি)। শৈলকুপার প্রতিটি ইউনিয়নে এখন ডিজিটাল সেন্টার রয়েছে। আগে জন্মনিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ, ওয়ারিশ কায়েম সনদ বা পাসপোর্ট করার তথ্যের জন্য মানুষকে শহরে গিয়ে দালালদের খপ্পরে পড়তে হতো। এতে যেমন টাকা নষ্ট হতো, তেমনি সময়েরও অপচয় হতো। কিন্তু এখন গ্রামের মানুষ বাড়ির কাছের ডিজিটাল সেন্টারে গিয়ে খুব অল্প খরচে এবং কম সময়ে এসব সেবা পাচ্ছেন। এই কেন্দ্রগুলো যেন গ্রামের মানুষের জন্য এক জাদুকরী সমাধান নিয়ে এসেছে, যা তাদের যাতায়াত খরচ ও মূল্যবান সময় দুটোই বাঁচাচ্ছে।
ভূমি সেবায় হয়রানি থেকে চিরতরে মুক্তি
আমাদের দেশে জমিজমা সংক্রান্ত বিষয় মানেই একসময় ছিল চরম হয়রানি আর ভোগান্তির নাম। শৈলকুপার সাধারণ মানুষকে জমির পর্চা তোলা বা খাজনা দেওয়ার জন্য দিনের পর দিন ভূমি অফিসে ঘুরতে হতো। কিন্তু এখন ই-পর্চা এবং অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা দেওয়ার সুবিধা চালু হওয়ায় সেই পুরনো ভোগান্তি আর নেই। সাধারণ মানুষ এখন নিজের স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের দোকান থেকে অনলাইনে জমির খাজনা পরিশোধ করতে পারছেন এবং ঘরে বসেই পর্চার কপি হাতে পাচ্ছেন। দালালদের দৌরাত্ম্য কমে যাওয়ায় ভূমি সেবায় এক অভাবনীয় স্বচ্ছতা ফিরে এসেছে এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস দূর হয়েছে।
কৃষকের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে ই-কৃষি
শৈলকুপা একটি কৃষিনির্ভর এলাকা। এখানকার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষি। আগে ফসলে পোকা ধরলে বা কোনো রোগ দেখা দিলে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শের জন্য কৃষকদের অপেক্ষায় থাকতে হতো। কিন্তু এখন কৃষকরা হাতে থাকা স্মার্টফোনের মাধ্যমেই ‘কৃষি বাতায়ন’ বা বিভিন্ন কৃষি অ্যাপ ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক সমাধান পাচ্ছেন। এছাড়া সার ও বীজের ভর্তুকির টাকা বা সরকারি প্রণোদনা এখন সরাসরি কৃষকের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে চলে আসছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির এই ব্যবহারের কারণে শৈলকুপার কৃষকরা এখন অনেক নিশ্চিন্তে আধুনিক চাষাবাদ করতে পারছেন এবং তাদের প্রতারিত হওয়ার সুযোগ কমে গেছে।
ঘরে বসেই স্বাস্থ্যসেবা ও টেলিমেডিসিন
উন্নত চিকিৎসার জন্য আগে শৈলকুপার মানুষকে ঝিনাইদহ সদর, ফরিদপুর বা ঢাকায় ছুটতে হতো। এখনো বড় রোগের জন্য শহরে যেতে হয় ঠিকই, কিন্তু সাধারণ বা প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য এখন আর এত কষ্ট করতে হয় না। টেলিমেডিসিন সেবার মাধ্যমে গ্রামের মানুষ এখন ঘরে বসেই ভিডিও কলের মাধ্যমে বড় বড় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নিতে পারছেন। বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ইন্টারনেট সুবিধা থাকায় খুব সহজেই স্বাস্থ্য বিষয়ক নানা তথ্য ও সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে। এতে গর্ভবতী মা ও বয়স্ক রোগীরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হচ্ছেন।
শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির আশীর্বাদ
শৈলকুপার শিক্ষা ব্যবস্থায় ডিজিটাল সেবার প্রভাব সত্যি প্রশংসনীয়। একসময় পরীক্ষার ফলাফল জানার জন্য শিক্ষার্থীদের স্কুলে গিয়ে নোটিশ বোর্ডের সামনে ভিড় করতে হতো। আর এখন ফলাফল প্রকাশের সাথে সাথেই মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে রেজাল্ট চলে আসে। স্কুল-কলেজে ভর্তির আবেদন থেকে শুরু করে পরীক্ষার ফি জমা দেওয়া—সবকিছুই এখন অনলাইনে হচ্ছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় মনোযোগ বাড়ছে। এছাড়া উপবৃত্তির টাকা সরাসরি শিক্ষার্থীদের বা অভিভাবকদের মোবাইলে চলে আসায় গরিব পরিবারের ছেলেমেয়েদের মাঝপথে স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার সহজলভ্যতা
বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা বা প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য আগে গ্রামের অসহায় ও দরিদ্র মানুষদের ব্যাংকের লম্বা লাইনে সারা দিন দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। বয়সের ভারে ন্যুব্জ অনেক মানুষের জন্য এটি ছিল চরম কষ্টের। কিন্তু এখন এই ভাতার টাকা বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে সরাসরি সুবিধাভোগীদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাচ্ছে। এর ফলে শৈলকুপার অসহায় মানুষদের আর কারো দয়ার ওপর বা দীর্ঘ লাইনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। তারা নিজেদের সুবিধামতো যেকোনো সময় বাড়ির কাছের দোকান থেকে টাকা তুলে নিতে পারছেন।
ই-কমার্স ও নারীদের আত্মনির্ভরশীলতা
ডিজিটাল সুবিধার কারণে শৈলকুপার অনেক নারী আজ ঘরে বসেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন। ইন্টারনেট আর স্মার্টফোনের কল্যাণে অনেকেই এখন অনলাইনে ছোটখাটো ব্যবসা বা ই-কমার্স শুরু করেছেন। কেউ হাতের কাজের পোশাক, কেউবা নিজের তৈরি খাবার ফেসবুক পেজের মাধ্যমে বিক্রি করছেন। ঘরে বসেই তারা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পণ্য পাঠাতে পারছেন। প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতা শৈলকুপার নারীদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়েছে এবং তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হতে দারুণভাবে সাহায্য করছে।
কিছু ছোটখাটো চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
ডিজিটাল সেবার এই চোখজুড়ানো সফলতার মাঝেও কিছু ছোটখাটো চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। গ্রামের অনেক বয়স্ক মানুষ এখনো স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট ব্যবহারে খুব একটা অভ্যস্ত নন। এছাড়া মাঝে মাঝে ইন্টারনেটের ধীরগতি বা সার্ভার ডাউন থাকার কারণে সেবা পেতে কিছুটা বিলম্ব হয়, যা মানুষকে সাময়িক বিরক্তির মধ্যে ফেলে। এই সমস্যাগুলো সমাধানে ইন্টারনেটের গতি ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে ডিজিটাল প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন ও প্রশিক্ষিত করতে হবে, যাতে সবাই এই সেবার সুফল পুরোপুরি ভোগ করতে পারেন।
উপসংহার
সব মিলিয়ে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ডিজিটাল সেবার প্রসারের ফলে শৈলকুপার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভোগান্তি জাদুর মতো কমে এসেছে। সরকারি ও বেসরকারি সেবাগুলো এখন আর সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে নেই, বরং তা মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। আগে যে মানুষটি সরকারি অফিসে যাওয়ার কথা শুনলেই ভয়ে কুঁচকে যেতেন, আজ তিনি হাসিমুখে ডিজিটাল সেন্টার থেকে সেবা নিচ্ছেন। এই পরিবর্তন এক দিনে আসেনি, এর পেছনে রয়েছে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার। শৈলকুপার এই ডিজিটাল রূপান্তর প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তি কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে শান্তি আর স্বস্তি এনে দিতে পারে। আগামী দিনে এই সেবার মান আরও উন্নত হলে শৈলকুপা একটি পূর্ণাঙ্গ স্মার্ট ও আধুনিক উপজেলা হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, যা আমাদের সবার কাম্য।
















