বিকেলে অফিস বা ক্লাস শেষে রাস্তার ধারের ফুচকা, চটপটি, পুরি বা শিঙাড়া দেখলে আমাদের সবারই জিভে পানি চলে আসে। শহরের অলিগলি বা ফুটপাতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এসব স্ট্রিট ফুডের স্বাদ নেন। আমরা অনেকেই নিয়মিত এসব খাবার খাই কারণ এগুলো দামে সস্তা এবং খেতে সুস্বাদু। কিন্তু এই মুখরোচক খাবারগুলো আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ লিভারের ঠিক কতটা ক্ষতি করছে, তা আমরা ভাবি না। চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে আমাদের দেশের প্রায় ২৫% থেকে ৩০% মানুষ লিভারের সমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে ফ্যাটি লিভার ও হেপাটাইটিস সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। রাস্তার খাবার মানেই যে সবসময় ক্ষতিকর, বিষয়টি তেমন নয়। তবে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নোংরা পানি এবং বারবার ব্যবহার করা পোড়া তেল খাবারগুলোকে লিভারের জন্য চরম হুমকিতে পরিণত করে।
রাস্তার খাবার থেকে লিভারের ক্ষতির সবচেয়ে বড় কারণ হলো দূষিত পানির ব্যবহার এবং বিক্রেতার অপরিষ্কার হাত। অনেক সময় রাস্তার ধারের দোকানিরা একই বালতির পানিতে বারবার প্লেট, চামচ বা বাটি ধুয়ে নেন। সারাদিন ওই এক বালতি পানিতেই সব পরিষ্কার করেন তারা। এই নোংরা পানি এবং বিক্রেতার হাত থেকে হেপাটাইটিস এ এবং হেপাটাইটিস ই ভাইরাস খুব সহজেই খাবারের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। এই ভাইরাসগুলো সরাসরি লিভারে সংক্রমণ ঘটায় এবং জন্ডিসের মতো মারাত্মক রোগ তৈরি করে। লিভারে বড় ধরনের সংক্রমণ হলে রোগীকে মাসের পর মাস বিছানায় কাটাতে হয়। তখন চিকিৎসার পেছনে অনেক পরিবারের ৫০০$ থেকে ১ হাজার ডলার পর্যন্ত অনায়াসেই খরচ হয়ে যায়।
ভাজাপোড়া খাবারের দোকানে গেলে আপনি প্রায়ই দেখবেন কড়াইয়ের তেল একদম কুচকুচে কালো হয়ে আছে। দোকানিরা সামান্য কিছু টাকা বাঁচাতে একই তেল বারবার গরম করে দিনের পর দিন খাবার ভাজেন। বিজ্ঞানীদের মতে, একই তেল বারবার গরম করলে তাতে মারাত্মক ক্ষতিকর ট্রান্সফ্যাট এবং রাসায়নিক উপাদান তৈরি হয়। এই কালো পোড়া তেলের খাবার নিয়মিত খেলে লিভারে খুব দ্রুত অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে আমরা ফ্যাটি লিভার বলি। শুধু তাই নয়, এই ক্ষতিকর রাসায়নিক লিভারের কোষে মারাত্মক প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়।
রাস্তার খাবারে সাধারণত সবচেয়ে সস্তা ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করেন বিক্রেতারা। বাজার থেকে তারা অনেক সময় অর্ধেক দামে বা ৫০% ছাড়ে বাসি মাংস এবং প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া সবজি বা মসলা কিনে আনেন। এসব পুরোনো মসলা বা বাসি খাবারে একধরনের ক্ষতিকর ফাঙ্গাস বা ছত্রাক জন্ম নেয়। এই ফাঙ্গাস থেকে ‘অ্যাফ্লাটক্সিন’ নামের এক ভয়ংকর বিষাক্ত পদার্থ তৈরি হয়। আপনি যদি নিয়মিত এই ধরনের নিম্নমানের মসলা বা পুরোনো খাবার খান, তবে দীর্ঘমেয়াদে আপনার লিভারের কোষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসকদের মতে, এই বিষাক্ত পদার্থের কারণে একজন মানুষের লিভার ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৪০% পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
ফাস্টফুড বা রাস্তার খাবারে স্বাদ বাড়ানোর জন্য দোকানিরা প্রচুর পরিমাণে তেল, চিনি এবং টেস্টিং সল্ট মেশান। এছাড়া খাবারকে ক্রেতাদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় করে তুলতে তারা প্রায়ই সস্তা কৃত্রিম রং বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করেন। তন্দুরি চিকেন, কাবাব বা জিলাপির সুন্দর লাল ও হলুদ রং মূলত এসব ক্ষতিকর রাসায়নিকেরই ফল। নিয়মিত অতিরিক্ত চিনি, লবণ এবং এসব বিষাক্ত রং পেটে গেলে মানুষের ওজন খুব দ্রুত বাড়ে। অতিরিক্ত ওজনের কারণে লিভার তার কাজ ঠিকমতো করতে পারে না। ফলে একসময় লিভার সিরোসিসের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
খোলা পরিবেশে খাবার তৈরির কারণে চারপাশের ধুলোবালি, গাড়ির কালো ধোঁয়া এবং ক্ষতিকর ভারী ধাতু সহজেই খাবারে মিশে যায়। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আমরা যখন খোলা খাবার খাই, তখন খাবারের স্বাদ নিলেও আসলে আমরা বিষ গিলছি। বছরের পর বছর এই দূষিত কণাগুলো আমাদের লিভারে জমতে থাকে। লিভার মূলত আমাদের শরীরের ছাঁকনি হিসেবে কাজ করে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়। কিন্তু রাস্তার দূষিত খাবারের কারণে লিভারের ওপর যখন অতিরিক্ত চাপ পড়ে, তখন সেটি আর শরীরের বিষাক্ত পদার্থ বের করতে পারে না। ফলে ধীরে ধীরে লিভার সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে।
এত সব ঝুঁকির কথা শুনে আপনি হয়তো ভাবছেন রাস্তার খাবার খাওয়া একেবারেই ছেড়ে দেবেন। বিষয়টি আসলে সম্পূর্ণ সচেতনতার। লিভারের ক্ষতি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে আপনাকে কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলতে হবে। আপনি সবসময় এমন দোকান থেকে খাবার কিনবেন, যেখানে নিয়মিত ক্রেতা থাকে এবং খাবার বেশিক্ষণ জমে থাকে না। সবসময় চোখের সামনে তৈরি করা গরম ও সদ্য রান্না করা খাবার খাবেন। রাস্তার পাশের খোলা সালাদ বা আগে থেকে কেটে রাখা ফল খাওয়া একেবারেই এড়িয়ে চলবেন। কড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে যদি দেখেন তেল খুব কালো বা পুরোনো, তবে সেখান থেকে কোনো কিছু কিনে খাবেন না। মাসে ১-২ দিন শখ করে স্ট্রিট ফুড খেলে লিভারের ক্ষতি হয় না। কিন্তু প্রতিদিনের অভ্যাস লিভারকে ধ্বংস করতে পারে।
















