জ্বালানি তেলের প্রভাবে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী ধারা: এপ্রিলে ছাড়াল ৯ শতাংশ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে ৯.০৪ শতাংশে পৌঁছেছে। মার্চ মাসে এই হার ছিল ৮.৭১ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এক অশনিসংকেত।

টানা চার মাস মূল্যস্ফীতি বাড়ার পর মার্চ মাসে তা কিছুটা কমেছিল। কিন্তু এপ্রিলে তা আবার বেড়ে যাওয়ায় গত ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসই মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরে থাকল। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮.৩৯ শতাংশ, যা আগের মাসে ছিল ৮.২৪ শতাংশ। একই সঙ্গে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৯.৫৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা মার্চে ছিল ৯.০৯ শতাংশ। শহর ও গ্রাম, উভয় এলাকাতেই মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এপ্রিলে গ্রামে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৯.০৫ শতাংশ এবং শহরে তা ৯.০২ শতাংশে পৌঁছেছে।

অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতির এই উল্লম্ফনের পেছনে প্রধান কারণ হলো জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। গত ১৯ এপ্রিল সরকার দেশের বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা ও পেট্রল ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মে মাসেও এই দাম অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন ও পণ্য উৎপাদন খরচে, যার ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব বাজারে এরই মধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। গত কয়েক সপ্তাহে শাকসবজি, ব্রয়লার মুরগি, ডিম ও মাছ-মাংসের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। যদিও চালের দাম এখনও তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে, তবে অন্যান্য পণ্যের দাম বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিবিএসের তথ্যমতে, এপ্রিল মাসে জাতীয় গড় মজুরি হার ছিল ৮.১৬ শতাংশ। এর অর্থ হলো, বাজারে পণ্যের দাম যে হারে বাড়ছে, মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে বা বিভিন্ন খাতে ব্যয় কাটছাঁট করতে বাধ্য হতে হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান আক্রমণকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তার ঢেউ লেগেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। তবে, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন আশ্বস্ত করেছেন যে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম এখনও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সরকার চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে।

সার্বিকভাবে, মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় শঙ্কার বিষয়। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, বাজার মনিটরিং জোরদার করা এবং বিকল্প নীতি গ্রহণ না করলে স্বল্পমেয়াদে এই মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে আছে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, যাতে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা হলেও সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ