মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে আবার যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। হরমুজ প্রণালিতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামের এক বিশেষ সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অভিযানে থাকা মার্কিন বাণিজ্যিক বা সামরিক জাহাজে ইরান যদি কোনো ধরনের হামলা চালানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে তাদের ‘পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে মুছে ফেলা’ হবে বলে কড়া হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখন অনেক বেশি উন্নত মানের এবং প্রচুর পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুত রয়েছে। সারা বিশ্বে তাদের সামরিক সরঞ্জাম ও ঘাঁটি ছড়িয়ে আছে, যেগুলো অত্যাধুনিক অস্ত্রে পরিপূর্ণ। প্রয়োজন হলে তারা এসবের শতভাগ (১০০%) ব্যবহার করতে একটুও পিছপা হবেন না। তবে তিনি এও মনে করেন যে শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয় আচরণ করছে।
ট্রাম্পের এই কড়া হুমকির মাঝেই যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজ সফলভাবে হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। বিখ্যাত শিপিং কোম্পানি মেয়ার্স্ক সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে যে, তাদের ‘অ্যালায়েন্স ফেয়ারফ্যাক্স’ নামের জাহাজটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর কড়া পাহারায় কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই এই বিপজ্জনক প্রণালি পার হতে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধের কারণে এই জাহাজটি গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে ছিল। মেয়ার্স্ক আরও জানায়, মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের সাথে যোগাযোগ করে একটি নিশ্ছিদ্র ও বিস্তৃত নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করে। এরপরই জাহাজটিকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সবুজ সংকেত দেওয়া হয়। এই সফল অভিযানের জন্য কোম্পানিটি মার্কিন বাহিনীর পেশাদারিত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে জাহাজ পার করার যে দাবি করেছে, তাকে ‘ডাহা মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে ইরান। দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, গত কয়েক ঘণ্টায় কোনো মার্কিন বাণিজ্যিক জাহাজ বা তেলের ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মোটেও চলাচল করেনি। ইরানের শীর্ষ বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ আইআরজিসির বরাত দিয়ে এই খবর প্রকাশ করেছে। আইআরজিসি এক কড়া বিবৃতিতে বলেছে, মার্কিন কর্মকর্তাদের এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং মনগড়া। তারা মূলত নিজেদের সামরিক ব্যর্থতা ঢাকতে এবং বিশ্বের সামনে নিজেদের শক্তি জাহির করতেই এমন ভুয়া খবর ছড়াচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই মুখোমুখি অবস্থানের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর। দেশটিতে হঠাৎ করেই ইরানের দিক থেকে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। হামলার আশঙ্কায় আমিরাত সরকার দেশজুড়ে জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। দেশটির জাতীয় জরুরি সংকট এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে। সেখানে বলা হয়, আমিরাতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি মোকাবিলা করছে। মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এই প্রথম আমিরাত সরকার এমন জরুরি সতর্কতা জারি করল। সাধারণ মানুষের মনে এই মুহূর্তে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ইরানের এই হামলায় আমিরাতের অন্যতম প্রধান ফুজাইরা পেট্রোলিয়াম স্থাপনায় ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। ফুজাইরার মিডিয়া অফিস নিশ্চিত করেছে যে, ইরান থেকে আসা একটি ড্রোন সরাসরি ওই তেল স্থাপনায় আঘাত হানলে সেখানে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। এই ঘটনায় সেখানে কর্মরত তিন ভারতীয় নাগরিক আহত হয়েছেন। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, তবে স্বস্তির বিষয় হলো তাদের আঘাত খুব বেশি গুরুতর নয়। এই হামলার পর আমিরাতের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ইরান থেকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের মোকাবিলা করছে। এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যে বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছে, তা মূলত আমিরাতের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শত্রুর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ধ্বংস করার শব্দ। এর আগে মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ইরান অন্তত চারটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল, যার মধ্যে তিনটি আকাশে ধ্বংস করা হয়েছে এবং একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেসামরিক এলাকা এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় ইরানের এই বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে প্রতিবেশী দেশ কাতার। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি টেলিফোনে সরাসরি আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছেন। এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে কাতারের আমিরের দপ্তর জানায়, কাতার যেকোনো বিপদে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করছে। একই সাথে দেশটির নিরাপত্তা, অখণ্ডতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আমিরাত সরকার যেসব পদক্ষেপ নেবে, তার প্রতি কাতারের পূর্ণ সমর্থন থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত। বিশ্ববাজারের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০% এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম ব্যারেলে ১০
থেকে২০থেকে২০
(ডলার) পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে, যা সরাসরি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি তৈরি করবে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী অত্যন্ত কষ্ট করে কাজ করেন। সেখানে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে আমাদের প্রবাসীদের জীবন যেমন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে, তেমনি দেশে রেমিট্যান্স আসাও অনেক কমে যাবে। তাই এই সংকটের দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধান এখন সবার কাম্য।
















