ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে গর্ভবতী গাভি জবাই, মাংস ব্যবসায়ীর অর্থদণ্ড ও মাংস ধ্বংস

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সকালে পরিবারের জন্য তাজা ও নিরাপদ মাংস কিনতে বাজারে যান সাধারণ মানুষ। কিন্তু বেশি লাভের আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এমন কাজ করেন, যা শুনে সাধারণ মানুষ রীতিমতো শিউরে ওঠেন। এমনই এক অমানবিক ও ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলায়। সেখানে পেটে বাছুর বা ভ্রূণ থাকা অবস্থায় একটি গাভি জবাই করে বিক্রির চেষ্টা করছিল এক কসাই। এই জঘন্য অপরাধে আজ শনিবার, ২ মে সকালে ওই মাংস ব্যবসায়ীকে কঠোর শাস্তির আওতায় এনেছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন।

শনিবার সকালে উপজেলার সাফদারপুর বাজারে প্রতিদিনের মতোই স্বাভাবিক কেনাবেচা চলছিল। ঠিক এমন সময় গোপন একটি নির্ভরযোগ্য খবর পেয়ে বাজারে আকস্মিক অভিযান চালান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোহেল রানা। প্রশাসন দলবল নিয়ে বাজারে ঢুকলে অসাধু ব্যবসায়ীদের মধ্যে রীতিমতো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ম্যাজিস্ট্রেট সরাসরি নির্দিষ্ট মাংসের দোকানে যান। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান, মো. ফজলুর রহমান নামের এক ব্যবসায়ী অত্যন্ত নির্মমভাবে পেটে বাছুর থাকা একটি গাভি জবাই করেছেন। শুধু তাই নয়, বিক্রির জন্য দোকানে ঝুলিয়ে রাখা ওই পশুর মাংসের মানও ছিল অত্যন্ত খারাপ ও অস্বাস্থ্যকর।

অপরাধ হাতেনাতে প্রমাণ হওয়ার পর ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোহেল রানা সাথে সাথেই সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসান। তিনি ‘পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১১’-এর ২৪ ধারায় ওই অসাধু ব্যবসায়ীকে নগদ ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী এই জরিমানার পরিমাণ প্রায় ১২৫$ ডলারের সমান। এরপর জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে দোকান থেকে প্রায় ২৫ কেজি অস্বাস্থ্যকর ও অবৈধ মাংস জব্দ করে প্রশাসন। পরে উপস্থিত সাধারণ মানুষের সামনেই সেই দূষিত মাংস মাটিতে বড় গর্ত করে পুঁতে নষ্ট করা হয়, যাতে সেগুলো আর কেউ বিক্রি করতে বা খেতে না পারে।

এমন সফল অভিযান শেষে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোহেল রানা গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে কথা বলেন। তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা এবং পশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রশাসন কোনো ধরনের আপস করবে না। গর্ভবতী পশু বা বাছুরসহ গাভি জবাই করা কেবল দেশের আইনেই বড় অপরাধ নয়, এটি চরম অমানবিক একটি কাজ। মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্যের ব্যবস্থা করতে এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় ১০০% স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে প্রশাসন আগামীতেও এমন অভিযান নিয়মিত চালিয়ে যাবে বলে তিনি সাধারণ ভোক্তাদের আশ্বস্ত করেন।

সাফদারপুর বাজারের সাধারণ ক্রেতারা প্রশাসনের এই সাহসী পদক্ষেপ দেখে বেশ খুশি হয়েছেন। স্থানীয় লোকজনের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, এই বাজারে একটি বড় অসাধু সিন্ডিকেট রয়েছে। তারা দীর্ঘ দিন ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রায়ই অসুস্থ ও নিয়মবহির্ভূত পশু জবাই করে আসছিল। দেশে প্রতিদিন যত মানুষ বাজার থেকে মাংস কেনেন, তার অন্তত ৪০% মানুষ এই ধরনের অসাধু চক্রের কারণে কোনো না কোনোভাবে প্রতারণার শিকার হন। অস্বাস্থ্যকর ও রোগাক্রান্ত পশুর মাংস খেয়ে মানুষ নানা ধরনের জটিল পেটের রোগে আক্রান্ত হন, যার চিকিৎসায় তাদের হাজার হাজার টাকা খরচ করতে হয়।

পশু জবাই ও মাংস নিয়ন্ত্রণ আইনটি মূলত দেশের সাধারণ মানুষের সুরক্ষার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। এই আইনের বিধান যদি কেউ লঙ্ঘন করেন, যেমন পেটে বাছুরসহ গাভি জবাই করেন বা পচা মাংস বিক্রি করেন, তবে তার জন্য কঠোর শাস্তির নিয়ম রয়েছে। এমন অপরাধের জন্য একজন অপরাধীকে সর্বোচ্চ ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বনিম্ন ৫ হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে।

আজকের এই কঠোর শাস্তির পর সাফদারপুর বাজারের অন্যান্য মাংস ব্যবসায়ীরাও এখন অনেক বেশি সতর্ক হয়ে গেছেন। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, শুধু জরিমানা করলেই হবে না, অসাধু ব্যবসায়ীদের সামাজিকভাবেও বয়কট করতে হবে। স্থানীয়রা জোরালোভাবে আশা করছেন, প্রশাসনের এমন কড়া নজরদারির ফলে অচিরেই বাজারের মাংসের দোকানগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং মানুষ নিরাপদ আমিষ কিনে বাড়ি ফিরতে পারবেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ