ঝিনাইদহে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) সারের ডিলার নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম, নগ্ন স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের গুরুতর অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে জেলায় বেপরোয়া চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং সার, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে দলটি। আজ জেলা জামায়াত কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন জেলা আমীর ও ঝিনাইদহ-২ আসনের সংসদ সদস্য আলী আজম মো. আবু বকর। সংবাদ সম্মেলনে ঝিনাইদহ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মতিয়ার রহমান, ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবু তালিব, জেলা নায়েবে আমীর অধ্যাপক মো. আলিমুজ্জামান ও জেলা সেক্রেটারি অধ্যাপক আব্দুল আউয়াল, ঝিনাইদহ সদর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান,অধ্যাপক আব্দুল হাই এবং মুহাদ্দিস মাওলানা মোঃ রবিউল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা কোনো নির্দিষ্ট দল বা পরিবারের পৈতৃক সম্পত্তি নয়। ডিলার নিয়োগে প্রার্থীর সততা, আর্থিক সামর্থ্য ও অভিজ্ঞতার বদলে রাজনৈতিক পরিচয় ও নগদ টাকার লেনদেনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। জামায়াতের অভিযোগ, জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার শিমলা-রোকনপুর ও ত্রিলোচনপুরে জেলা বিএনপি সভাপতির আত্মীয়দের ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মহেশপুরের শ্যামকুড় ও যাদবপুর ইউনিয়নে যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার স্বজনদের ডিলার বানানো হয়েছে এবং আজমপুরে এক এমপিওভুক্ত মাদরাসা শিক্ষককে বেআইনিভাবে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। সদর ও হরিণাকুণ্ডুতে নিজস্ব দোকান বা গুদাম না থাকা সত্ত্বেও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও সুবিধাবাদী চক্রের সদস্যদের মাঝে এই ডিলারশিপ বিতরণ করা হয়েছে।
প্রশাসনের নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে নেতারা বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি কমিটিতে দলীয়করণ করে প্রতি বদলিতে লাখ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন চলছে। এছাড়া জেলা পরিষদের বিভিন্ন শূন্যপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে জুলাই বিপ্লবে শহীদ ও নির্যাতিত পরিবারগুলোকে পুরোপুরি বঞ্চিত করা হয়েছে। উল্টো জেলা পরিষদের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তাঁদের প্রায় ১০০% ছেলে, ভাতিজা ও নিকটাত্মীয়দের মধ্যে এসব পদ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। এমনকি দলবাজি করে হরিজন সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা সুইপার পদেও বিধিবহির্ভূতভাবে এক মুসলিম যুবককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।
নেতাকর্মীদের ওপর ধারাবাহিক হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত সেপ্টেম্বর মাসে শৈলকুপায় দলীয় গণসংযোগ শেষে মসজিদে নামাজ পড়ে ফেরার পথে সরকারি দলের সন্ত্রাসীরা জামায়াত নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত সশস্ত্র হামলা চালায়। ওই হামলায় অন্তত ৮ জন নেতাকর্মী রক্তাক্ত হন, যাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক এবং তিনি ঢাকায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আহতদের চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। হরিণাকুণ্ডুতেও একই কায়দায় জামায়াত কর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে। সরকারি দলের প্রশ্রয়ে থাকা সন্ত্রাসীরা এসব হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করে অবিলম্বে জড়িতদের গ্রেপ্তারের জোর দাবি জানান বক্তারা।
জেলায় চাঁদাবাজির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আলী আজম মো. আবু বকর জানান, ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা সড়কে সাধারণ ভ্যানচালক ও ইজিবাইকচালকদের কাছ থেকে প্রতিদিন প্রকাশ্যে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। অথচ পুলিশ ও প্রশাসন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এছাড়া যশোর-ঝিনাইদহ সিক্স লেন মহাসড়ক প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণেও কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও কমিশন বাণিজ্য চলছে, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় কয়েক মিলিয়ন ডলারের ($) সমান। ক্ষমতাসীনদের এহেন দখলদারির কারণে জেলার প্রায় ৮০% সাধারণ মানুষ ও কৃষক সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
পরিস্থিতি উত্তরণে সংবাদ সম্মেলন থেকে ৬ দফা জরুরি দাবি ঘোষণা করেছে জামায়াত। এর মধ্যে রয়েছে অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া সব ব্যক্তির ডিলারশিপ বাতিল, বর্তমান সার-বীজ মনিটরিং কমিটি পুনর্গঠন, সড়ক ও প্রকল্পের চাঁদাবাজি বন্ধ, নিত্যপণ্য ও সারের দাম কমানো, শিক্ষক বদলি কমিটিতে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সুপারিশ কার্যকর করা এবং শিক্ষাঙ্গনে দলীয় সন্ত্রাস বন্ধ করা। জামায়াত নেতারা বলেন, তাঁরা এমন এক দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে চান, যেখানে কোনো চাকরি বা ডিলারশিপ পেতে ঘুষ ও রাজনৈতিক পরিচয় লাগবে না এবং কৃষক ন্যায্য মূল্যে সময়মতো সার পাবেন। জুলাই আন্দোলনের কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার ও সুশাসন নিশ্চিত করাই এখন জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
















