শৈলকুপায় ডোপ টেস্টে মাদক সেবনের প্রমাণ: সাতজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিল আদালত

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের শৈলকুপা থানা-পুলিশের বিশেষ অভিযানে আটক হওয়া সাতজন মাদকসেবীর সবার শরীরেই ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ তাঁদের আটক করে। আটকের পরপরই চিকিৎসকদের দিয়ে ডোপ টেস্ট করালে আটক সাতজনের দেহেই শতভাগ (১০০%) মাদক সেবনের প্রমাণ পান চিকিৎসকেরা। এরপর পুলিশ তাঁদের দ্রুত আদালতে হাজির করলে বিজ্ঞ বিচারক সংক্ষিপ্ত বিচার বা সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণ পেয়ে সবাইকে বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড ও নগদ অর্থদণ্ডের আদেশ দেন। রায় ঘোষণার পর পুলিশ তাঁদের জেলা কারাগারে পাঠায়।

শৈলকুপা থানা সূত্র জানায়, সমাজ থেকে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার নির্মূল করতে এবং যুবসমাজকে রক্ষা করতে পুলিশ নিয়মিত এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। বৃহস্পতিবার দিনভর পুলিশ সদস্যরা উপজেলার বিভিন্ন চিহ্নিত মাদকস্পট ও নির্জন এলাকাগুলোতে ঝটিকা তল্লাশি চালান। অভিযানে সন্দেহভাজন হিসেবে এই সাতজনকে আটক করেন পুলিশ সদস্যরা। আটকের পর আসামিদের কোনো ধরনের ফাঁকফোকর না দিতে পুলিশ তাঁদের আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আওতায় এনে ডোপ টেস্ট করায়। ল্যাব পরীক্ষায় প্রত্যেকের রক্তে নিষিদ্ধ মাদকের উপস্থিতি অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়। এরপর পুলিশ দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি প্রতিবেদন তৈরি করে তাঁদের আদালতে তোলে।

বিজ্ঞ আদালত অভিযুক্তদের অপরাধের মাত্রা এবং বয়সের দিক বিবেচনা করে পৃথক মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানার রায় দেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে তিন তরুণকে আদালত সর্বোচ্চ এক বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। এঁরা হলেন—শৈলকুপার রয়েড়া গ্রামের নূর ইসলামের ছেলে মো. পরশ ইসলাম (১৯), পিড়াগাতি গ্রামের মৃত আজিজাল বিশ্বাসের ছেলে জায়েদ বিশ্বাস (২৫) এবং খানপাড়া এলাকার আক্তার খানের ছেলে আব্দুল হাদি (২০)। আদালত এই তিনজনের প্রত্যেককে ১,০০০ টাকা করে নগদ অর্থদণ্ডও দিয়েছেন। এই জরিমানা অনাদায়ে তাঁদের অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য চার আসামির মধ্যে তিনজনকে ছয় মাস করে এবং একজনকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন বিচারক। মহিষাগাড়ি গ্রামের মো. তোবারেক হোসেনের ছেলে মো. বাদল (২৬) এবং রয়েড়া গ্রামের সেকেন্দার মণ্ডলের ছেলে মো. রাজন ওরফে সজিবকে (২৩) আদালত ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করেছেন। জরিমানা না দিলে তাঁদের আরও সাত দিন জেলে থাকতে হবে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী মাগুরা জেলার শালিখা থানার ভাটয়াইল গ্রামের বাদশা মুন্সীর ছেলে রাকিব মুন্সীকেও (২১) আদালত ছয় মাসের জেল ও ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন। অন্যদিকে বিজুলিয়া গ্রামের ৫২ বছর বয়সী প্রবীণ ব্যক্তি ভুট্ট মোল্লাকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

আদালত দণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামির কাছ থেকে সর্বমোট ৫,০০০ টাকা অর্থদণ্ড আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় ৪২ ডলার ($৪২) সমমূল্যের। এই জরিমানার অর্থ সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, দণ্ডপ্রাপ্তদের একজন পার্শ্ববর্তী মাগুরা জেলা থেকে শৈলকুপায় এসে মাদক সেবন করছিলেন। এতে বোঝা যায় যে মাদক চক্রগুলো আন্তজেলা যোগাযোগের মাধ্যমে তরুণদের বিপথগামী করার চেষ্টা করছে। তবে পুলিশের কড়া নজরদারির কারণে এসব অপরাধপ্রবণ স্পটে মাদকসেবীদের আনাগোনা আগের তুলনায় প্রায় ৭০% থেকে ৮০% কমে এসেছে।

আইনজীবীরা বলছেন, মাদকসেবীদের তাৎক্ষণিক ডোপ টেস্ট করিয়ে সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে সাজা দেওয়া আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। অতীতে মাদক মামলার বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লাগত এবং অনেকে জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধে জড়াত। কিন্তু এখন বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিচারকাজ শেষ করছেন। এতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি পুরোপুরি ভাঙছে এবং অন্যান্য মাদকসেবীদের মধ্যেও চরম ভীতি তৈরি হচ্ছে। দ্রুত শাস্তির কারণে বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাও শতভাগ বেড়ে গেছে।

শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হুমায়ূন কবির মোল্লা বলেন, ঝিনাইদহ জেলাকে সম্পূর্ণ মাদক ও অপরাধমুক্ত না করা পর্যন্ত পুলিশের এই বিশেষ অভিযান পুরোদমে চলবে। মাদকের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তিকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে অভিভাবক ও এলাকার সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, মাদক কারবারি কিংবা সেবনকারীদের সম্পর্কে পুলিশকে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিন, পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ