দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। আজ বৃহস্পতিবার এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় জানায়, আগ্রহী প্রবাসীকর্মীরা সরকারের অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়া যাওয়ার যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন। একই সঙ্গে অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ পাবেন। বিজ্ঞপ্তির সবচেয়ে বড় চমক হলো, বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ প্রায় ১০,০০০ কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (জিরো কস্ট) নেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। এতে কোনো অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয় ছাড়াই বিদেশে কর্মসংস্থানের এক নতুন আশার আলো দেখছেন দেশের লাখ লাখ তরুণ।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) মেনেই মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় কর্মী নিয়োগের নীতিমালা তৈরি করেছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা পাঠানো হলে মালয়েশিয়া কিছু শর্ত শিথিল করে। এরপর বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়েই শ্রমবাজার চালুর উদ্যোগ নেয়। প্রধানমন্ত্রী নিজের প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া গিয়ে বিষয়টি নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করেন। সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল অতীতের কুখ্যাত সিন্ডিকেট ভেঙে সর্বোচ্চসংখ্যক বৈধ এজেন্সিকে যুক্ত করা এবং কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় নাগালের মধ্যে রাখা।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুসারে, মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি ‘বোয়েসেল’ এবং ২৫টি বেসরকারি এজেন্সিকে মূল প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এর বাইরে আরও ৩১২টি বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিকে কাজ করার সরাসরি অনুমোদন দিয়েছে দেশটি। এর ফলে তালিকাভুক্ত ৩১২টি এজেন্সির প্রত্যেকেই মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে সরাসরি চাহিদাপত্র (ডিমান্ড লেটার) সংগ্রহ করতে পারবে। এরপর তারা দেশে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী বাছাই ও নিয়োগের যাবতীয় প্রাথমিক কাজ পরিচালনা করবে। এর মাধ্যমে কর্মী প্রেরণে কোনো নির্দিষ্ট চক্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেট পুরোপুরি বন্ধ হবে।
কর্মী পাঠানোর পুরো কার্যক্রমটি মূলত চারটি ধাপে শেষ করবে এজেন্সিগুলো। প্রথম ধাপে অনুমোদিত এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে নিজস্ব দক্ষতায় চাহিদাপত্র আনবে। দ্বিতীয় ধাপে তারা দেশের প্রচলিত আইন মেনে কর্মী নির্বাচন করবে। তৃতীয় ধাপে প্রশাসনিক কাজের অংশ হিসেবে কলিং ভিসা ও ই-ভিসা প্রস্তুত করতে বোয়েসেল এবং তালিকাভুক্ত ২৫টি সার্ভিস এজেন্সি প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে। সবশেষে চতুর্থ ধাপে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে সংশ্লিষ্ট এজেন্সি নিজ নামেই চূড়ান্ত বহির্গমন ছাড়পত্র গ্রহণ করতে পারবে।
অভিবাসন বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, অতীতে মালয়েশিয়া যেতে একজন সাধারণ কর্মীকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা খরচ করতে হতো, যা প্রায় $৩,৫০০ থেকে $৪,০০০ ডলারের সমান। মন্ত্রণালয় এবার কঠোর অবস্থান নিয়ে জানিয়েছে, কোনো কর্মীকে আর অতিরিক্ত দেনার বোঝার মধ্যে পড়তে দেওয়া হবে না। কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় অন্তত ৫০% থেকে ৬০% কমিয়ে আনার বিষয়ে সরকার অনড়। অতিরিক্ত ফি নিলে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলের হুঁশিয়ারি দিয়েছে মন্ত্রণালয়। সাধারণ প্রবাসীরা যাতে কোনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর প্রতারণার শিকার না হয়ে সাশ্রয়ী খরচে বিদেশে যেতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাবে।
বিদেশযাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়েও কড়া সতর্কতা জারি করেছে সরকার। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী দুই দেশ যৌথভাবে মেডিকেল সেন্টার চূড়ান্ত করবে। মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধিদল খুব শিগগিরই ঢাকায় এসে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করবে। বর্তমানে মালয়েশিয়ার নিজস্ব ওয়েবসাইটে থাকা অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারে পরীক্ষা চালু থাকবে। সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, মেডিকেল টেস্ট নিয়ে কোনো ক্লিনিক যদি দুর্নীতি বা জালিয়াতি করে, তবে তার অনুমোদন তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করবে স্বাস্থ্য ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুরোপুরি সচল হলে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটবে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, এই সিদ্ধান্তের ফলে আগামী অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মালয়েশিয়া থেকে পাঠানো অর্থের অংশ অন্তত ২০% থেকে ২৫% বেড়ে যাবে। প্রবাসীদের এই ঘামঝরা আয় দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে বড় ভূমিকা রাখবে। মন্ত্রণালয় দেশের বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে কর্মীদের অধিকার শতভাগ (১০০%) সুরক্ষিত রেখে সততার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে মানুষ নিরাপদে ও সম্মানজনকভাবে বিদেশে কাজ করতে পারে।















