ঝিনাইদহের শৈলকুপা থানা-পুলিশের বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযানে আটক পাঁচ মাদকসেবীর সবার শরীরেই ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। গতকাল বুধবার (১৪ অক্টোবর) উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ তাঁদের আটক করে। আটকের পর চিকিৎসকদের মাধ্যমে ডোপ টেস্ট করানো হলে আটক পাঁচজনের দেহেই শতভাগ (১০০%) মাদক সেবনের প্রমাণ মেলে। এরপর তাঁদের বিজ্ঞ আদালতে হাজির করলে বিচারক সংক্ষিপ্ত বিচার বা সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণ পেয়ে সবাইকে বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড ও নগদ অর্থদণ্ডের আদেশ দেন। রায় ঘোষণার পরপরই পুলিশ তাঁদের জেলা কারাগারে পাঠায়।
শৈলকুপা থানা সূত্রে জানা গেছে, এলাকাকে মাদকমুক্ত করতে এবং তরুণ প্রজন্মকে বিপথগামী হওয়া থেকে বাঁচাতে নিয়মিত মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। বুধবার সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন নির্জন এলাকা ও চিহ্নিত মাদক আড্ডায় ঝটিকা তল্লাশি চালান পুলিশ সদস্যরা। সেখান থেকে সন্দেহভাজন হিসেবে এই পাঁচজনকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়। পুলিশ কোনো ধরনের আইনি ফাঁকফোকর না রাখতে সরকারি হাসপাতালের ল্যাবে আধুনিক পদ্ধতিতে তাঁদের ডোপ টেস্ট করায়। পরীক্ষায় প্রত্যেকের রক্ত ও প্রস্রাবে মাদকের ক্ষতিকর উপাদানের অকাট্য প্রমাণ ধরা পড়ে। পুলিশ বিলম্ব না করে প্রয়োজনীয় ডকেট প্রস্তুত করে আসামিদের আদালতে তোলে।
বিজ্ঞ আদালত আসামিদের অপরাধের ধরন ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে পৃথক মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানার রায় দেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে দুই যুবককে সর্বোচ্চ ৯ মাস করে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন বিচারক। তাঁদের একজন হলেন পার্শ্ববর্তী কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার পান্টি গ্রামের মো. কামরুজ্জামানের ছেলে মো. রাব্বি হোসেন (২৫)। আদালত তাঁকে ৯ মাসের কারাদণ্ড ও ২০০ টাকা জরিমানা করেছেন। এই অর্থ না দিলে তাঁকে অতিরিক্ত আরও ১০ দিন সাজা খাটতে হবে। একই মেয়াদে ৯ মাসের কারাদণ্ড ও ২০০ টাকা জরিমানা পেয়েছেন শৈলকুপার পদমদী গ্রামের মৃত জহির উদ্দিনের ছেলে মো. লিটন মোল্লা (২৮)।
দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য তিন আসামির মধ্যে আনন্দনগর স্কুলপাড়ার আয়াত আলীর ছেলে মো. লাল চাঁদ হোসেনকে (৩২) আদালত ৮ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১,০০০ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন, অনাদায়ে আরও ৭ দিন জেল খাটতে হবে। দুধসর কাঁঠালপাড়া এলাকার মো. মিল্টন হুসাইনের ছেলে মো. সাকিল হোসেনকে (৩০) বিচারক ৭ মাসের কারাদণ্ড ও ১,০০০ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা না দিলে তাঁর সাজা আরও ৭ দিন বাড়বে। এছাড়া মালিপাড়ার রশিদ লস্কারের ২৩ বছর বয়সী ছেলে তিতাস লস্কারকে আদালত ৭ মাসের কারাদণ্ড এবং ২০০ টাকা অর্থদণ্ড দেন। এই অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাঁকে অতিরিক্ত ১০ দিন বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
বিজ্ঞ আদালত পাঁচ আসামির কাছ থেকে সর্বমোট ২,৬০০ টাকা নগদ অর্থদণ্ড আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী এই জরিমানার টাকা সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হবে। আইনজীবীরা জানান, মাদকসেবীদের তাৎক্ষণিক ডোপ টেস্ট করিয়ে সামারি ট্রায়ালে বিচার করার ফলে অপরাধীরা কোনো ধরনের মিথ্যা অজুহাত দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। অতীতে মাদক মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলেও বর্তমানে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতির কারণে শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মামলার রায় ঘোষণা সম্ভব হচ্ছে।
পুলিশের তথ্যমতে, দণ্ডপ্রাপ্তদের একজন পার্শ্ববর্তী কুষ্টিয়া জেলা থেকে এসে শৈলকুপায় মাদক গ্রহণ করছিলেন। স্থানীয় সচেতন মহল জানান, বিভিন্ন জেলা থেকে মাদকসেবীরা এসে গ্রামীণ পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করছিল। তবে থানা-পুলিশের এমন অনড় অবস্থানের কারণে উপজেলার বাজার ও অলিগলিতে মাদকসেবীদের আনাগোনা আগের চেয়ে প্রায় ৭০% থেকে ৮০% কমে গেছে। বখাটে ও মাদকাসক্তদের এমন প্রকাশ্য বিচারে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরছে।
শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হুমায়ূন কবির মোল্লা বলেন, ঝিনাইদহ জেলাকে সম্পূর্ণ মাদক ও অপরাধমুক্ত না করা পর্যন্ত পুলিশের এই বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি মাদক কারবারি ও মাদকসেবীদের হুঁশিয়ার করে বলেন, সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী কাউকেই পুলিশ বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না। তিনি তরুণ সমাজকে বাঁচাতে এলাকার অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, নিজ নিজ এলাকায় মাদক সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া মাত্রই পুলিশকে জানান, পুলিশ শতভাগ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেবে।
















