শৈলকুপায় ডোপ টেস্টে মাদক প্রমাণ: দুই যুবকের ১ বছর কারাদণ্ড

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের শৈলকুপায় মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে আটক দুই ব্যক্তির শরীরে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর তাদের এক বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। শৈলকুপা থানা পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর চিকিৎসকের মাধ্যমে ডোপ টেস্ট করা হলে দুজনের ফলাফলই পজিটিভ আসে। এরপর পুলিশ দ্রুত তাঁদের সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠায়। বিজ্ঞ বিচারক সংক্ষিপ্ত বিচার বা সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে সব তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে রায় ঘোষণা করেন। রায়ে দুই আসামিকে ১ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০০ টাকা করে জরিমানা করা হয়। জরিমানা না দিলে তাঁদের আরও ১৫ দিন বিনাশ্রম জেল খাটতে হবে। বিচারকের নির্দেশে রায় ঘোষণার পরপরই তাঁদের সরাসরি জেলা কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন শৈলকুপা উপজেলার ঝাউদিয়া গ্রামের মোঃ শহিদুল ইসলামের ছেলে মোঃ রইচ উদ্দিন এবং একই উপজেলার নাগপাড়া এলাকার মোঃ নুর ইসলামের ছেলে মোঃ ইলিয়াস। থানা সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শৈলকুপা থানা পুলিশের একটি চৌকস দল ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। সন্দেহভাজন হিসেবে এই দুজনকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়। তাঁদের আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করায় পুলিশ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। হাসপাতালে নিয়ে ডোপ টেস্ট করানো হলে তাঁদের রক্তের নমুনায় প্রায় ১০০% মাদকের রাসায়নিক উপাদানের স্পষ্ট প্রমাণ মেলে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, আগে মাদকসহ হাতেনাতে না ধরলে অনেক সময় সেবনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রমাণ হাজির করা কঠিন হতো। তবে এখন আধুনিক ডোপ টেস্ট চালু হওয়ায় অপরাধীদের পার পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকছে না। রইচ ও ইলিয়াসের রিপোর্ট পজিটিভ আসার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ নিখুঁত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে আদালতে হাজির করে। আদালতে বিজ্ঞ বিচারক সামারি ট্রায়ালের ধারা অনুসরণ করে স্বল্প সময়ের মধ্যে শুনানি শেষ করেন। শুনানিতে আসামিরা নিজেদের পক্ষে কোনো জোরালো যুক্তি তুলে ধরতে পারেননি। আদালত আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সাজা প্রদান করেন এবং দ্রুত রায় কার্যকর করার নির্দেশ দেন।

সীমান্তবর্তী জেলা ঝিনাইদহের বিভিন্ন উপজেলায় মাদকের কারবার বন্ধ করতে দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, বিভিন্ন চোরাই পথে আসা ফেনসিডিল, গাঁজা কিংবা ইয়াবার কারণে স্থানীয় যুবসমাজের প্রায় ৩০% থেকে ৪০% তরুণ বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। আন্তর্জাতিক চক্রগুলো বছরে লাখ লাখ ডলার বা $ সমমূল্যের নিষিদ্ধ মাদক সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করে থাকে। ফলে পরিবার ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি সমাজে চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ বেড়ে যায়। সেই প্রেক্ষাপটে সেবনকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনি ব্যবস্থার আওতায় আনার এই কৌশলকে স্থানীয় সাধারণ মানুষ দারুণ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

অভিযান ও আদালতের রায়ের বিষয়ে শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা বলেন, আমরা সমাজকে মাদক ও অপরাধমুক্ত করতে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এই বিশেষ অভিযান কেবল একদিনের জন্য নয়, বরং এটি দিনরাত ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকবে। মাদকের সঙ্গে যুক্ত সেবনকারী কিংবা বিক্রেতা—কারও প্রতি বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে পুলিশ শতভাগ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কোনো প্রভাবশালী মহলের তদবির এখানে কোনো কাজে আসবে না।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে আদালতের এই দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক রায় অন্যদের জন্য বড় একটি সতর্কবার্তা। অতীতে মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় অপরাধীরা সহজে জামিনে বের হয়ে আবারও অপকর্মে জড়াত। কিন্তু ডোপ টেস্টের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং সামারি ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ায় অপরাধপ্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে। শৈলকুপাকে মাদকমুক্ত রাখতে শুধু পুলিশের পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়, পরিবারের অভিভাবক এবং সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকেও নিজেদের সন্তানদের চলাফেরার ওপর কড়া নজর রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।

পুলিশের মাদকবিরোধী এই অভিযানের কারণে এলাকার মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঝাউদিয়া ও নাগপাড়া এলাকায় রাতে মাদকসেবীদের প্রকাশ্য আনাগোনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছিল। আদালতের এই কড়া পদক্ষেপের পর অপরাধীদের ভেতর ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, এমন নিয়মিত অভিযান চালু থাকলে অঞ্চলের প্রায় ৮০% মাদক নির্মূল হবে এবং যুবসমাজ একটি সুস্থ জীবনের দিশা পাবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ