জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে। দলের শীর্ষ দুই পদ অর্থাৎ আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব আখতার হোসেন নিজেদের জায়গায় বহাল থাকছেন। তবে সাংগঠনিক কাঠামো গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার কিংবা আগামীকাল বুধবারের মধ্যেই এই পুনর্গঠিত কমিটির চূড়ান্ত তালিকা সবার সামনে প্রকাশ করা হবে। দলের শীর্ষ নেতারা বলছেন, পদ বণ্টন করার ক্ষেত্রে এবার নেতাদের কাজের দক্ষতা ও মাঠের ভূমিকাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন এই কাঠামোতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও হাসনাত আবদুল্লাহ জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন। অন্যদিকে সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে দেওয়া হচ্ছে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিবের গুরুদায়িত্ব। দলের ভেতরে এতদিন শীর্ষ ১১টি পদ পরিচিত ছিল ‘সুপার ইলেভেন’ হিসেবে। তবে নতুন বিন্যাসের মাধ্যমে সেই বলয় ভেঙে এখন ‘সুপার সিক্স’ বা ৬ সদস্যের কোর টিম রূপ নিচ্ছে। দলের প্রায় ৭০% তরুণ নেতাকর্মীর মতে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতেই এই পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছিল।
২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন এনসিপি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে, তখন থেকেই দলের সাংগঠনিক কাজ এগিয়ে নিচ্ছিলেন পাটওয়ারী, হাসনাত ও সারজিস। পরবর্তীতে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে দলে যোগ দিয়ে মুখপাত্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দল গঠনের পর থেকে নির্বাচন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটগুলোতে এই চার নেতার ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। তৃণমূলের কর্মীদের দাবি ছিল, প্রায় ১০০% নিষ্ঠার সঙ্গে রাজপথে লড়াই করা এসব সক্রিয় নেতাদের যেন নীতিনির্ধারণী পদে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
বর্তমানে এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম হিসেবে কাজ করছে ১৬ সদস্যের রাজনৈতিক পর্ষদ। পদাধিকারবলে আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব এই পর্ষদের অংশ। তাঁদের সাথে নতুন চার শীর্ষ নেতা যুক্ত হয়ে দল পরিচালনা করবেন। পর্ষদের বাকি ১০ সদস্যকে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব দিয়ে দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন এবং বিশেষ সেলের কাজ তদারকি করতে দেওয়া হবে। উল্লেখ্য, বর্তমান জাতীয় সংসদে এনসিপির ৮ জন সংসদ সদস্য প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাঁদের মধ্যে মাহমুদা আলম ও নুসরাত তাবাসসুম সংরক্ষিত নারী আসনের প্রতিনিধি। সংসদ ও রাজপথ উভয় ময়দানেই দলের অবস্থান মজবুত করাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।
দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের অংশ হিসেবে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার কথাও ভাবছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি শাখার আয়-ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরির পাশাপাশি বিদেশে থাকা সমর্থকদের পাঠানো অনুদানের ক্ষেত্রেও কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে। শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রতি $১ ডলারের অনুদানও যেন দলীয় নিয়মে খরচ হয়, সেদিকে খেয়াল রাখছে অডিট সেল। এছাড়া ২০২৭ সালের শুরুতে দলের প্রথম জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের একটি পরিকল্পনা রয়েছে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে অতিরিক্ত পদ কমিয়ে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে চায় দল।
কমিটি পুনর্গঠনের কারণ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন দলের দায়িত্বশীল নেতারা। এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন জানান, শুরুতে একটি সাধারণ আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বাস্তবতায় বহু নতুন ব্যক্তি দলের কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। তাঁদের সবাইকে সংগঠনে জায়গা করে দেওয়ার জন্য অনেক নতুন পদ সৃষ্টি করতে হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর দেখা গেছে, সবাই সমান ভূমিকা রাখতে পারেননি। কেউ হয়তো ৫০% দায়িত্বও ঠিকমতো পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, আবার কেউ শতভাগ সক্রিয় থেকে দলকে প্রতিকূল সময়েও এগিয়ে নিয়েছেন। সেই পারফরম্যান্স বা কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই এবার কাঠামোগত রদবদল আনা হচ্ছে, যাতে সংগঠন আরও সংহত রূপ পায়।
এদিকে শীর্ষ নেতৃত্বের এই নতুন রূপরেখা নিয়ে দলের ভেতরেই ভিন্ন বিতর্ক দেখা দিয়েছে। খবরের প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক পর্ষদের প্রভাবশালী সদস্য সারোয়ার তুষার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করেন। তিনি দৃঢ়ভাবে জানান, এনসিপিতে ‘সুপার সিক্স’ নামের কোনো ফোরামের অস্তিত্ব নেই এবং এ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো অনুচিত। দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণ করে ১৬ সদস্যের রাজনৈতিক পর্ষদ এবং এর প্রতিটি সদস্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নতুন কমিটি ঘোষণার আগমুহূর্তে এই অভ্যন্তরীণ বিতর্ক জাতীয় নাগরিক পার্টির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন কৌতূহল এবং উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে।















