রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেয়ালচিত্রে (গ্রাফিতি) চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব এ এন এম (আল নূর মোহাম্মদ) আয়াসসহ চারজনকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। রোববার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এই আদেশ দেন। পুলিশ তাদের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিল। তবে শুনানি শেষে আদালত আয়াস ও মো. সাকিবুল হাসানের ৩ দিন করে এবং মো. সুজন মিয়া ও মারজিয়া খন্দকার রিমির ২ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আদালত প্রাঙ্গণে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।
গ্রেপ্তার হওয়া চারজনের মধ্যে আয়াসের বয়স ২৯ বছর, সাকিবুলের ১৯ বছর, সুজনের ১৮ বছর এবং মারজিয়া খন্দকার রিমির বয়স ২৭ বছর। আয়াস একসময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্কিত নানা কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি আলোচনায় আসেন। গত ৫ অক্টোবর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সেগুনবাগিচা এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করে সাধারণ মানুষের চলাচলের উপযোগী করে তোলে। এরপর ফুটপাতসংলগ্ন দেয়ালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ সংস্কৃতিতে অবদান রাখা ১০ জন বরেণ্য ব্যক্তির প্রতিকৃতি আঁকা হয়। কিন্তু গত ১০ অক্টোবর আয়াস দলবল নিয়ে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের সেই দেয়ালচিত্র মুছে দেওয়ার চেষ্টা চালান।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রিমান্ড আবেদনে আদালতকে জানান, আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে উসকানি ছড়াতেই আসামিরা এমন ঘৃণ্য কাজ করেছেন। দেশের ১০০% ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিরোধ বাধানোই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে আঁকা প্রায় $১,৫০০ (ডলার) মূল্যের এসব শৈল্পিক দেয়ালচিত্র নষ্ট করার পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে কি না, পুলিশ তা খতিয়ে দেখতে চায়। পুলিশ দাবি করে, এটি কেবল একটি সাধারণ দেয়ালচিত্র বিকৃত করা নয়, বরং পরিকল্পিত অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অংশ।
আসামিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় দণ্ডবিধির ১২০ (খ), ১৫৩ (ক) এবং ২৯৫ (ক) ধারায় অভিযোগ এনেছে পুলিশ। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দণ্ডবিধির ১২০ (খ) ধারাটি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত। এতে অপরাধের ধরন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড হতে পারে। অন্যদিকে ১৫৩ (ক) ধারা অনুযায়ী, কোনো চিহ্ন, কথা বা লেখার মাধ্যমে নাগরিকদের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে শত্রুতা বা ঘৃণা ছড়ালে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড কিংবা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া ২৯৫ (ক) ধারায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অপরাধে অভিযুক্ত হলে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার নিয়ম আছে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই চূড়ান্ত অপরাধী বলা যাবে না।
আদালতে শুনানির সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী মনির হোসাইন রিমান্ডের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি যুক্তি তুলে ধরে আদালতকে বলেন, চার আসামির বিরুদ্ধে যে ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে, তাতে তাদের জেলে পাঠানোর মতো কোনো শক্ত উপাদান নেই। তিনি মন্তব্য করেন, এমন ঘটনা একটি চড় মেরে সমাধান করা যেত, সেখানে রিমান্ডের আবেদন সম্পূর্ণ বাড়াবাড়ি। আইনজীবীর দাবি, আসামিরা কোনো বড় অপরাধ করেননি, তাই তাদের জামিন দেওয়া উচিত। তবে রাষ্ট্রপক্ষ এই যুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপের দাবি জানায়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবং ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী আদালতে বলেন, আসামিদের এই অপতৎপরতা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একপ্রকার প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা। আসামিরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হতে এবং জনমনে আতঙ্ক ছড়াতে মব তৈরি করছেন। তারা ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার করে সম্প্রীতি ধ্বংস করতে চান। পিপি আরও বলেন, নগরের উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে বাধা দেওয়াই তাদের স্বভাব। এদের পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্রকারী চক্র রয়েছে কি না এবং কারা তাদের মদদ দিচ্ছে, রিমান্ডে নিয়ে তা উদঘাটন করা অত্যন্ত জরুরি।
রাজধানীর সচেতন নাগরিক সমাজ ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের মতো ব্যক্তিত্বরা সমগ্র জাতির সম্পদ। তাদের প্রতিকৃতিতে চুনকালি দেওয়া মুক্তচিন্তা ও সুস্থ সংস্কৃতির ওপর সরাসরি আঘাত। এমন উসকানিদাতার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে অপরাধীরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠবে। পুলিশ জানিয়েছে, রিমান্ডে এনে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এই চক্রান্তের শিকড় পর্যন্ত পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে।















