চুয়াডাঙ্গা জেলায় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং সীমান্ত এলাকায় অপরাধ দমন করতে মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রবিবার সকাল ১০টায় চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এই সভা শুরু হয়। সভায় বক্তারা জেলার সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শতভাগ প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। সীমান্তবর্তী এই জেলায় মাদক ও চোরাচালানের মতো অপরাধের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে প্রশাসন কোনো ধরনের ছাড় দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লুৎফুন নাহার। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল। বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার খন্দকার গোলাম শাহরিয়ার। এছাড়া সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শরীফুজ্জামান শরীফ। সভায় বক্তারা বলেন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বজায় রাখতে প্রশাসন ও জনগণকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। কোনো অপরাধীকেই রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে রেহাই দেওয়া হবে না।
সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় চুয়াডাঙ্গায় ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালান ও মাদকের অনুপ্রবেশ বন্ধে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের (৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হাসান জানান, সীমান্ত এলাকায় বিজিবি দিনরাত ২৪ ঘণ্টা কড়া পাহারা দিচ্ছে। বিজিবি ও পুলিশের যৌথ উদ্যোগে গত কয়েক মাসে কোটি টাকার চোরাই পণ্য আটক করা হয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোর লেনদেন নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। সভায় জানানো হয়, সীমান্তবর্তী পথ দিয়ে প্রায় $50,000 সমমূল্যের বিভিন্ন অবৈধ পণ্যের পাচার রোধে আধুনিক স্ক্যানার ও বিশেষ নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা চলছে। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা বা জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলতে পুলিশ ও বিজিবিকে কঠোর নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা নিয়েও সভায় দীর্ঘ আলোচনা হয়। বক্তারা জানান, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম যেন অযৌক্তিকভাবে ১০% বা ২০% বাড়িয়ে না দেওয়া হয়, সেজন্য নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ খালেদ মাহমুদ জানান, অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের কারসাজি ভাঙতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা জোরদার করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে $ বা ডলারের দামের ওঠানামার অজুহাত দেখিয়ে কেউ যেন স্থানীয় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয়। অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বড় অঙ্কের জরিমানা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে একমত হন কর্মকর্তারা।
শহর ও গ্রামের অলিগলিতে জননিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে পুলিশি টহল বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। সম্প্রতি কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত ও ইভটিজিংয়ের মতো ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, স্কুল-কলেজ ছুটির সময়ে এবং সন্ধ্যার পর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে নিয়মিত পুলিশ মোতায়েন থাকবে। অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলা হয়, সন্তানরা কোথায় সময় কাটাচ্ছে সেদিকে যেন তারা নজর রাখেন। তরুণ সমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে সামাজিক সচেতনতা তৈরির ওপর সভায় বিশেষ জোর দেওয়া হয়। এছাড়া সাইবার অপরাধ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর বিরুদ্ধেও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়।
স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ফারহানা ওয়াহিদ তানি। তিনি জানান, হাসপাতালে রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকরা দায়িত্ব পালন করছেন এবং জরুরি বিভাগে ওষুধের জোগান শতভাগ রাখার চেষ্টা চলছে। এছাড়া সভায় জেলার বিভিন্ন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের প্রধানরা নিজ নিজ এলাকার সমস্যা তুলে ধরেন। চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ পারভেজ রাসেল তাঁর বক্তব্যে বলেন, প্রশাসনকে জনগণের সেবক হয়ে কাজ করতে হবে। সভা শেষে জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার চুয়াডাঙ্গাকে একটি শান্তিময় ও অপরাধমুক্ত জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে সকলের আন্তরিক সহযোগিতা চেয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।















