ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) বাড়তি রাজনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দিতে ভোটার তালিকায় বড় ধরনের কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সরাসরি রাজপথে নেমেছে দেশটির বিক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্ম। শুক্রবার বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক ময়দানে জেন-জি নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ করে। একই সময়ে রাজধানী নয়াদিল্লির বিখ্যাত প্রতিবাদ কেন্দ্র যন্তর মন্তরে পূর্বঘোষিত এক সমাবেশ করতে গেলে পুলিশ চারপাশ ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলে এবং বিরোধী রাজনৈতিক নেতাসহ বহু আন্দোলনকারীকে আটক করে।
বিরোধীদের অভিযোগ, ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনের নামে সাধারণ নাগরিকদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার গভীর চক্রান্ত চলছে। বিধানসভা নির্বাচনের আগে গত বছর বিহার রাজ্য থেকে এই কার্যক্রম শুরু হয়, যা পরে প্রায় সব রাজ্যেই চালু করে নির্বাচন কমিশন। সংশোধনের জন্য এমন সব জটিল কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে, যা জোগাড় করা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের পক্ষে অসম্ভব। নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব প্রাথমিক তথ্যে দেখা গেছে, বেশ কিছু নির্বাচনী এলাকায় ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৩০% পর্যন্ত ভোটারের নাম সরাসরি বাদ পড়তে পারে। বিরোধী দলগুলোর দাবি, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভোটার তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলে নির্বাচনে জেতার পথ পরিষ্কার করছে নরেন্দ্র মোদির সরকার।
ভোটার তালিকার এই বিতর্ক কেবল রাজপথেই নয়, ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভেতরেও বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে। শীর্ষস্থানীয় ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কমিশনের ডিজিটাল ব্যবস্থা ও ভোটার তালিকা সংশোধনের বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়ে বাকি দুই নির্বাচন কমিশনার আনুষ্ঠানিকভাবে কঠোর আপত্তি জানিয়েছিলেন। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার তিন সদস্যের সাংবিধানিক নিয়মে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সেই আপত্তি পুরোপুরি উড়িয়ে দেন। যদিও কমিশন দাবি করেছে, এটি তাদের অভ্যন্তরীণ আলোচনার অংশ ছিল, কোনো আনুষ্ঠানিক মতবিরোধ নয়; তবুও এই পদক্ষেপে স্বচ্ছতা নিয়ে দেশজুড়ে গুরুতর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
এদিকে নির্বাচন ব্যবস্থার এই ডিজিটাল আধুনিকীকরণের পেছনে ভারতের করদাতাদের প্রায় $১০০ মিলিয়ন বা এক হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ ব্যয় করেছে সরকার। তবে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে নাগরিক অধিকারবঞ্চিত করার অভিযোগে তরুণ সমাজ ক্ষোভে ফুঁসছে। ভারতে বর্তমানে যুব বেকারত্বের হার প্রায় ২৫% ছাড়িয়ে গেছে। কর্মসংস্থানের অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার সঙ্গে এবার ভোটের অধিকার হারানোর ভয় যুক্ত হওয়ায় দেশটির শিক্ষিত তরুণরা নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে একাট্টা হয়েছেন। তারা বলছেন, সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের ডলারে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।
এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে চলতি বছরের শুরুতে গড়ে ওঠা তরুণদের রাজনৈতিক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। শুরুতে চাকরির তীব্র সংকট ও সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলেন এই দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক। তাদের লাগাতার প্রতিবাদের মুখে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, যা মোদি সরকারের জন্য ছিল প্রায় ১০০% এক বড় ধরনের রাজনৈতিক পরাজয়। শিক্ষাক্ষেত্রের সেই প্রাথমিক বিজয়ের পর সংগঠনটি এখন প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে। শুক্রবার মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ পার্কে দাঁড়িয়ে অভিজিৎ সাফ জানিয়ে দেন, ভোটাধিকার হরণ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফিরবেন না।
ভারতের প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার তালিকায় এমন নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ দেশটির বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোকে চরম বিপদের মুখে ফেলেছে। নির্বাচন কমিশনের মতো স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে একটি বিশেষ দলের আজ্ঞাবহ সংস্থায় পরিণত করার যে অভিযোগ উঠেছে, তা রুখতে এখন এক কাতারে শামিল হচ্ছে ছাত্র, শিক্ষক ও বিরোধী জোট। আন্দোলনরত তরুণরা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, অবিলম্বে এই বিতর্কিত ভোটার ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে এবং পদত্যাগ করতে হবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে। পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ১০০% স্বচ্ছতা ও আস্থা ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত তারা দেশজুড়ে লাগাতার গণআন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার শপথ নিয়েছেন।















