মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় রণতরি পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র: মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে ইরানে হামলার প্রস্তুতি জোরদার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ যখন অষ্টম মাসে গড়াল এবং উভয় পক্ষই হামলা জোরদার করার পথ খুঁজছে, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় তৃতীয় একটি বিশালাকার বিমানবাহী রণতরি স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করছে যুক্তরাষ্ট্র। পেন্টাগনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নতুন এই অভিযানের মাধ্যমে তেহরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যেকোনো পদক্ষেপে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে সামরিক বিকল্প আরও বাড়বে। ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট রণতরি স্ট্রাইক গ্রুপটি সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো নৌঘাঁটি ছেড়ে পারস্য উপসাগরের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। এর সঙ্গে মার্কিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের দুই সহস্রাধিক মেরিন সেনাও রয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল নিশ্চিত করেছে, নতুন এই রণতরি ও অন্যান্য নৌ ইউনিটের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে আরও প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনা ও নাবিক যুক্ত হচ্ছেন। আগামী নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলের কাছাকাছি তিনটি শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরি ও দুটি উভচর অবতরণকারী দল সার্বক্ষণিক টহল দেবে। ওয়াশিংটনের সামরিক সূত্রগুলো বলছে, আলোচনার টেবিলে কূটনীতি যে পথেই এগোয় না কেন, তেহরানের ওপর সামরিক চাপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখতেই ট্রাম্প প্রশাসন এই রণপ্রস্তুতি বজায় রাখছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে এই বিশাল সামরিক বহর মোতায়েন করা হচ্ছে। অথচ আমেরিকার মাটিতে এই যুদ্ধের পক্ষে সাধারণ মানুষের সমর্থন এখন তলানিতে, যা মাত্র ৩৫% থেকে ৪০%-এ নেমে এসেছে। ভোটারদের বড় একটি অংশ বিদেশে এমন ব্যয়বহুল সংঘাতের বিরোধিতা করছেন। এতে আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে জরিপগুলো আভাস দিচ্ছে। তবে রাজনৈতিক ঝুঁকি সত্ত্বেও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন, ট্রাম্পের যেকোনো নতুন হামলার নির্দেশ বাস্তবায়নে মার্কিন বাহিনী শতভাগ প্রস্তুত।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দেখলে বোঝা যায়, ১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে লেবানন সংকটের সময় মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম সেনা পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মোট ১৯টি কৌশলগত স্থানে ওয়াশিংটনের সেনাঘাঁটি রয়েছে। এর মধ্যে স্থায়ী ঘাঁটি আটটি। আগে থেকেই সেখানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছিলেন। এর বাইরে গত ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ১২০টির বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে পেন্টাগন। এই বহরে রয়েছে রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম অত্যাধুনিক এফ-৩৫ ও এফ-২২ স্টিলথ ফাইটার এবং আকাশপথের নজরদারির জন্য তৈরি ই-৩ সেন্ট্রি অ্যাওয়াকস বিমান।

সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সমান্তরালে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার খড়্গও বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। চলতি সপ্তাহে ইরানের জাতীয় রেল ও গাড়ি নির্মাণ খাতের ওপর নতুন অবরোধ আরোপ করেছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়। এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে থাকা তেহরানের প্রায় $৬ বিলিয়ন বা ৬০০ কোটি ডলারের সম্পদ আটকে রাখা হয়েছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়ালৎস জানান, বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কিংবা আটকে থাকা ডলার ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট তারা তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে ইরানের অবশিষ্ট রাজস্বের শেষ উৎসটুকুও সম্পূর্ণ শুকিয়ে ফেলতে চায়।

মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে শান্তি আলোচনা চললেও তাতে কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি হয়নি। সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে কাতারের মধ্যস্থতায় হওয়া পরোক্ষ বৈঠকে ইরান সাত দিনের একটি সমঝোতা প্রস্তাব দিয়েছিল। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ তুলে নিলে ও ডলার ছাড় দিলে তেহরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন। এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হামলা মোকাবিলা করতে এবং সর্বাত্মক যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে তেহরান পুরোপুরি প্রস্তুত।

টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হলেই ইরানে মার্কিন বোমাবর্ষণের পরিধি আরও বাড়ানো হতে পারে। টেক্সাসের এক জনসভায় তিনি তেহরানকে সতর্ক করে বলেন, তাদের দ্রুত একটি সঠিক ও বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, নয়তো তারা বেশি দিন টিকতে পারবে না। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই ধরনের আগ্রাসী পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কূটনীতির সব দুয়ার কার্যত রুদ্ধ হয়ে আসায় বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে এখন চরম অস্থিরতার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ