চট্টগ্রাম নগরে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের আশ্রয়দাতাদের রাজনৈতিক পরিচয়ও বদলে গেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় অপরাধ সাম্রাজ্য চালাত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাদের অনেকেই এখন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের পাশে ভিড়ছেন। এর জলজ্যান্ত উদাহরণ ১৬ মামলার আসামি মো. মুরাদ। একসময় নগর যুবলীগের আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত মুরাদকে এখন নগর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক ওরফে বাদশার মিছিল-সমাবেশে নিয়মিত দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুরাদ নিজেকে চান্দগাঁও থানা যুবদলের সংগঠক হিসেবে জাহির করলেও সম্প্রতি বাকলিয়ায় মাদক নিয়ে সংঘর্ষের পর যুবদল তার দায় অস্বীকার করেছে।
মুরাদ একা নন, পুরো চট্টগ্রামজুড়েই এমন দলবদলের হিড়িক পড়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নগরের অন্তত ৪৫টি এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহ দৌরাত্ম্য চলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় রয়েছে ১১টি গ্যাং। যার মধ্যে সেভেন স্টার, ফাইভ স্টার, মোহাম্মদপুর বয়েজ সিন্ডিকেট (এমবিএস), খতিবের হাটের কেবি ও ৯৯৯ গ্যাং অন্যতম। গত সাড়ে সাত বছরে চট্টগ্রাম শহরে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা অন্তত ৬৩৫টি সহিংস অপরাধ ঘটিয়েছে, যার মধ্যে খুনের ঘটনাই ৩৯টি। এমনকি গত সপ্তাহেও মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে দুই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনা ঘটে।
গত মঙ্গলবার খুলশীর পাহাড়তলী ওয়্যারলেস কলোনিতে ‘ফাইভ স্টার’ ও ‘সেভেন স্টার’ গ্যাংয়ের কোন্দলে নির্মমভাবে খুন হয় ১৬ বছরের কিশোর মো. হৃদয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাবার সঙ্গে ফুটপাতে সবজি বিক্রি করা এই কিশোরের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির ২৩টি মামলার আসামি ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগার নিয়ন্ত্রণে চলছে এই সেভেন স্টার গ্যাং। ওয়াকিলকে সম্প্রতি নগর স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও এলাকায় তার ত্রাসের রাজত্ব এতটুকু কমেনি। এমনকি গত ২৯ আগস্ট পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক মিজানুর রহমানকে প্রকাশ্যে মারধর করে তার বাহিনীর সদস্যরা। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ বাসিন্দা—সবাই এই বাহিনীর কাছে জিম্মি হয়ে আছেন।
পুলিশ ২০১৮ সালে আদনান ইসফার হত্যার পর প্রথম দফায় ৪৮ জন রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’ বা পৃষ্ঠপোষকের তালিকা তৈরি করেছিল। পরে ২০২৪ সালের মার্চে আরও ১৬ জনের নাম তালিকায় ঢোকানো হয়। হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ২০০টি কিশোর গ্যাংয়ে ১ হাজার ৪০০-র বেশি সক্রিয় সদস্য ছিল। ৫ আগস্টের পর পুরোনো পৃষ্ঠপোষকদের প্রায় ৮০% এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দিলেও গ্যাংয়ের সদস্যরা এলাকাতেই বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। তারা এখন নতুন রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া খুঁজছে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী সাফ জানিয়েছেন, পুলিশের একার পক্ষে এই গ্যাং দমন সম্ভব নয়, রাজনৈতিক নেতাদেরও এদের প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
কিশোর গ্যাংগুলো এখন বড় ভাইদের নির্দেশে মাদক ব্যবসার প্রধান ঢাল হিসেবে কাজ করছে। নগরের শতাধিক স্পটে মাদক বিক্রি, দখলবাজি ও পাহারা দেওয়ার কাজে কিশোরদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব মাদকের আখড়া থেকে প্রতিদিন প্রায় $১৫,০০০ থেকে $২০,০০০ ডলার সমমূল্যের অবৈধ লেনদেন হয়। কিশোরদের হাত দিয়ে এই কারবার চালানোয় পুলিশের ওপর হামলার ঝুঁকিও বাড়ছে। গত আট মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ওপর অন্তত ৫ বার হামলা হয়েছে। এতে এসআই মবিনুল ইসলাম ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন এবং পুলিশের ওয়াকিটকি লুট হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, অন্তত ৭৫% কিশোর সদস্য প্রথমে মাদকাসক্ত হয়ে পরে এই সশস্ত্র গ্যাংয়ে নাম লেখায়।
অপরাধ বাড়লেও বিচারের ক্ষেত্রে রয়েছে চরম ধীরগতি। বর্তমানে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে কিশোর অপরাধের ১ হাজার ৬২৩টি মামলা ঝুলে রয়েছে। ২০১৮ সালের আলোচিত আদনান হত্যা মামলায় ২৬ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ১৭ জনের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে এবং সব আসামিই জামিনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সচেতন নাগরিক কমিটির (সুজন) চট্টগ্রাম সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, শুধু মাঠের কিশোরদের ধরে কোনো সুফল আসবে না। যারা নিজেদের ক্ষমতার স্বার্থে এই কিশোরদের অস্ত্র তুলে দিচ্ছে এবং রাজনৈতিক ঢাল বানাচ্ছে, সেই ‘বড় ভাইদের’ ১০০% আইনের আওতায় না আনলে এই রক্তক্ষয়ী গ্যাং কালচার কখনো বন্ধ হবে না।
















