জীবননগরে মোটরসাইকেলসহ ৭৫ বোতল ভারতীয় উইনসেরেক্স সিরাপ উদ্ধার, যুবক আটক

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সীমান্তবর্তী চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় এক বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে ভারতীয় মাদক উইনসেরেক্স সিরাপসহ ফিরোজ হোসেন (৩৫) নামের এক যুবককে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে জীবননগর ফিলিং স্টেশন এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। অভিযানের সময় তার হেফাজত থেকে ৭৫ বোতল নিষিদ্ধ ভারতীয় ‘উইনসেরেক্স’ সিরাপ, মাদক চোরাচালানে ব্যবহৃত একটি ১২৫ সিসির ডিসকভার মোটরসাইকেল এবং একটি ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন উদ্ধার করে বিজিবির সদস্যরা। আটক ফিরোজ জীবননগর উপজেলার উথলী ইউনিয়নের শাখারিয়া গ্রামের বাসিন্দা বরকতুল্লাহর ছেলে।

বিজিবি মহেশপুর ব্যাটালিয়ন (৫৮ বিজিবি) সূত্র জানায়, সীমান্ত এলাকায় মাদক ও সব ধরনের চোরাচালান রোধে তারা দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি চালিয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিজিবির কাছে গোপন সূত্রে খবর আসে যে সীমান্ত পেরিয়ে একদল চোরাকারবারি মাদকের বড় চালান নিয়ে দেশের ভেতরের দিকে ঢুকছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে বিজিবির জীবননগর বিওপির একটি বিশেষ টহল দল খুব ভোরে ফিলিং স্টেশন চত্বরে কৌশলগত অবস্থান নেয়। অভিযানের নেতৃত্ব দেন বিজিবির চৌকস হাবিলদার হাসমত আলী। শুক্রবার সকাল ঠিক সাড়ে ৬টার দিকে সীমান্ত পিলার ৬৭-এমপি থেকে আনুমানিক ৫ কিলোমিটার বাংলাদেশের ভেতরে সন্দেহভাজন ওই যুবক মোটরসাইকেল চালিয়ে এলে বিজিবি তাকে থামার সংকেত দেয়। কিন্তু সে পালানোর চেষ্টা করলে বিজিবি জওয়ানরা চারপাশ ঘিরে ফেলে তাকে ধরে ফেলে।

আটক করার পর বিজিবি সদস্যরা আরোহীর শরীর ও মোটরসাইকেলের বিভিন্ন অংশ নিবিড়ভাবে তল্লাশি করে। সাধারণত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে মাদক কারবারিরা নিত্যনতুন অভিনব পন্থা অবলম্বন করে। এক্ষেত্রেও ফিরোজ তার মোটরসাইকেলের তেলের ট্যাংকের নিচে ও সিটের ভেতরের অংশে বিশেষ গোপন কুঠুরি বানিয়ে এই ৭৫ বোতল সিরাপ লুকিয়ে রেখেছিল। বিজিবির ধারণা অনুযায়ী, জব্দ করা এসব ভারতীয় নিষিদ্ধ সিরাপের বর্তমান কালোবাজারি বাজারমূল্য প্রায় $১,৫০০ ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এছাড়া জব্দ করা ডিসকভার মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোনের আনুমানিক আর্থিক মূল্য আরও প্রায় $১,২০০ ডলারের কাছাকাছি।

সীমান্তবর্তী এলাকায় জনপ্রিয় ফেনসিডিলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ও সহজলভ্যতা কমে যাওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে ‘উইনসেরেক্স’ নামের এই ভারতীয় কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। স্থানীয় মাদক নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, গত কয়েক মাসে উদ্ধার হওয়া চালানের প্রায় ৬০% অংশজুড়েই ছিল এই নেশাজাতীয় সিরাপ। ভারতীয় এই কাশির সিরাপ অতিরিক্ত মাত্রায় সেবনের কারণে তরুণ ও যুবসমাজের মধ্যে মারাত্মক শারীরিক আসক্তি তৈরি হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুমোদনহীন এসব কাশির সিরাপে অতিরিক্ত মাত্রায় কোডিন ও রাসায়নিক থাকে, যা নিয়মিত খেলে মানুষের কিডনি, ফুসফুস ও লিভার ১০০% অকেজো হয়ে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়। অতি মুনাফার লোভে কারবারিরা এই বিষাক্ত পণ্য দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে মহেশপুর ব্যাটালিয়নের (৫৮ বিজিবি) সহকারী পরিচালক মুন্সী ইমদাদুর রহমান জানান, আটককৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে জীবননগর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। জব্দ করা যাবতীয় মাদকদ্রব্য, যানবাহন ও মুঠোফোনসহ তাকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব অটুট রাখতে বিজিবি জওয়ানরা সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। চোরাচালান, মাদক পাচার, পুশইন কিংবা যেকোনো অবৈধ তৎপরতা রুখতে আমাদের টহল দলগুলো রাতদিন সতর্ক রয়েছে। তরুণ সমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে সীমান্তজুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি আগের তুলনায় অন্তত ৪০% বাড়ানো হয়েছে এবং এই সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকবে।

এদিকে সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল বিজিবির এই দ্রুত ও সফল অভিযানকে আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানিয়েছেন। স্থানীয়দের বক্তব্য, নিয়মিত এমন কঠোর পদক্ষেপ চালু থাকলে চোরাচালান চক্রগুলো দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়বে। তবে তারা মনে করেন, কেবল মাঠপর্যায়ের বাহকদের আটকালেই সীমান্ত পুরোপুরি মাদকমুক্ত হবে না। এই বাণিজ্যের পেছনে যেসব প্রভাবশালী ব্যক্তি অর্থ লগ্নি করছে, তাদেরকেও দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় সচেতন অভিভাবকরা মনে করেন, সীমান্তে সার্বক্ষণিক কড়া পাহারা ও সমন্বিত নজরদারি বজায় রাখলে মাদক চোরাচালানের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। এতে এলাকার যুবসমাজ মাদকের হাত থেকে রক্ষা পাবে এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ