মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের গভীর বনাঞ্চলে এক বড় ধরনের দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেল আন্তঃনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস। শুক্রবার বিকেল ঠিক ৩টার দিকে সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী এই ট্রেনের পেছনের বগিগুলোর সংযোগকারী হুক হঠাৎ ভেঙে যায়। বিকট শব্দের পর ট্রেনের ইঞ্জিন কয়েকটি বগিসহ বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে যায়, আর যাত্রীবোঝাই বগিগুলো বনের ভেতরের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে। গহীন জঙ্গলে আচমকা এমন ঘটনায় ট্রেনের প্রায় ৯০০ যাত্রীর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে বড় ধরনের এই যান্ত্রিক ত্রুটির মধ্যেও ট্রেনের চালক তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি বুঝতে পারায় ১০০% যাত্রী সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছেন। কোনো প্রাণহানি বা বড় ধরনের জখমের ঘটনা ঘটেনি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ট্রেনটি ভানুগাছ স্টেশন পার হয়ে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাহাড়ি ঢালু পথ দিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটছিল। বনের এক নির্জন বাঁকে পৌঁছাতেই হঠাৎ ট্রেনের মাঝের একটি কাপলিং বা হুক প্রচণ্ড টানে ছিঁড়ে যায়। ট্রেনের সামনের অংশ প্রায় ৩০০ মিটার সামনে চলে যাওয়ার পর চালক স্বয়ংক্রিয় প্রেশার কমে যাওয়ার বিষয়টি লক্ষ্য করেন এবং জরুরি ব্রেক চেপে ট্রেন থামান। ট্রেনের পেছনের প্রায় ১০টি বগি তখন অন্ধকারাচ্ছন্ন বনের মাঝে আলাদা হয়ে থমকে দাঁড়ায়। চলন্ত ট্রেন এভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ভেতরে থাকা যাত্রীরা তীব্র ঝাঁকুনি অনুভব করেন এবং ওপরের র্যাক থেকে ভারী ব্যাগপত্র নিচে পড়ে যায়।
ঘটনার আকস্মিকতায় যাত্রীরা মনে করেছিলেন হয়তো ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়ে বড় কোনো খাদে পড়ে গেছে। চারপাশের গভীর অরণ্য, ঘন গাছপালা এবং মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক ২০% এর নিচে নেমে আসায় নারী ও শিশুদের মাঝে ভীতি বহু গুণ বেড়ে যায়। বনের ভেতরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই কী ঘটবে, তা ভেবে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। প্রায় আধা ঘণ্টা পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে উৎসুক যাত্রীরা বগি থেকে নেমে রেললাইনে ভিড় জমান। এই সুযোগে স্থানীয় বাসিন্দা ও জাতীয় উদ্যানে ঘুরতে আসা পর্যটকরাও ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হন। তারা আতঙ্কিত যাত্রীদের অভয় দেন এবং আশপাশের পাহাড়ি এলাকা থেকে বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির ব্যবস্থা করে দেন।
ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার গৌড়প্রসাধ দাস পলাশ জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ ও জরুরি উদ্ধারকারী দলকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, বিকেল ৩টার সময় হঠাৎ কাপলিং ভেঙে ইঞ্জিন সামনের কয়েকটি বগি নিয়ে কিছুটা সামনে চলে যায়। তবে চালক এবং পেছনের গার্ড দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় কোনো বগি লাইনচ্যুত হয়নি। প্রকৌশলীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট টানা চেষ্টা চালিয়ে নতুন পিন ও ক্যাবল লাগিয়ে ইঞ্জিন ও বগিগুলোর পুনঃসংযোগ সম্পন্ন করেন। এতে প্রাথমিক হিসেবে রেলওয়ের সরঞ্জাম মেরামত বাবদ প্রায় $৫০০ থেকে $৭০০ ডলারের মতো তাৎক্ষণিক ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা ধারণা প্রকাশ করেছেন।
এই যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে সিলেট-চট্টগ্রাম এবং সিলেট-ঢাকা রেলপথে ট্রেন চলাচল প্রায় আড়াই ঘণ্টার জন্য বন্ধ থাকে। ফলে পেছনের বিভিন্ন স্টেশনে আটকে পড়া ঢাকাগামী আন্তঃনগর জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ও অন্যান্য লোকাল ট্রেনের যাত্রীদেরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। রেলওয়ের প্রায় ৮০% শিডিউল এই অঞ্চলে সাময়িকভাবে কিছুটা বিঘ্নিত হলেও বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটের দিকে পাহাড়িকা এক্সপ্রেস পুনরায় গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। উদ্ধারকারী দলের তৎপরতায় লাইন ক্লিয়ার হওয়ার পরই এই রুটে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
যাত্রীরা অভিযোগ করেন, পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের বহু পুরোনো বগি দিয়ে এখনো আন্তঃনগর ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে। নিয়মিত তদারকির অভাব ও দুর্বল ফিটনেস পরীক্ষার কারণে মাঝেমধ্যেই এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ট্রেনের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটারের বেশি থাকত বা কোনো খাড়া পাহাড়ি ঢালে এই হুক ছিঁড়ত, তাহলে বগিগুলো পেছনের দিকে গড়িয়ে গিয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারত। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার মূল কারণ খতিয়ে দেখতে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে।
















