১৩ কোটি ভোটারের নাম কেটে দেশজুড়ে তোপের মুখে ভারতের নির্বাচন কমিশন: বাদ পড়াদের ফেরাতে বিশেষ উদ্যোগ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ভোটার তালিকা থেকে নির্বিচারে কোটি কোটি মানুষের নাম বাদ দিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের মুখে পড়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে নিজেদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে কমিশন। গতকাল বৃহস্পতিবার কমিশন জানিয়েছে, ভারতের ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কার্যক্রমে বাদ পড়া বৈধ ভোটারদের নাম ফিরিয়ে আনতে তারা বিশেষ অভিযান শুরু করবে। নতুন ভোটারদের পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই বৈধ ভোটারদের নাম আবার তালিকায় তুলবেন জেলা নির্বাচনী কর্মকর্তা ও ব্লক পর্যায়ের প্রতিনিধিরা।

এসআইআরের আওতায় নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে এক ধাক্কায় ২০টি রাজ্য ও অঞ্চল থেকে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে কেটে ফেলেছে। মৃত, স্থানান্তরিত বা ভুয়া ভোটারের নাম কাটার বিষয়ে আপত্তি না থাকলেও লাখ লাখ সাধারণ বৈধ নাগরিককে ‘অবৈধ’ তকমা দিয়ে বাদ দেওয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন বিরোধীরা। অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকে জেতাতেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই কাজ করেছেন। কমিশনের ভেতরের অবস্থাও চরম উত্তপ্ত। খোদ অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি গত ১০ মাসে জ্ঞানেশ কুমারের একতরফা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ১৪ বার আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের এমন সিদ্ধান্তের ফলে গোটা দেশের ভোটার তালিকার ভারসাম্য পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ২০১৪ সালে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোতে মোট ভোটার ছিল ৭৬ কোটি ৬০ লাখ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯২ কোটি ৮০ লাখে এবং এসআইআর শুরুর ঠিক আগে ভোটারের সংখ্যা ছিল ৯৫ কোটি ২০ লাখ। কিন্তু কমিশন মাত্র কয়েক মাসের অভিযানে নাম কেটে খসড়া তালিকায় ভোটারের সংখ্যা নামিয়ে এনেছে ৮১ কোটি ৭৯ লাখে। অর্থাৎ জনসংখ্যা বাড়লেও ২০২৬ সালের ভোটার তালিকা গিয়ে ঠেকেছে ঠিক এক দশক আগের ২০১৫ সালের ৮১ কোটি ৬৯ লাখের ঘরে।

বিভিন্ন রাজ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় ভোটার বাতিলের হার দেখে তাজ্জব বনে গেছেন বিশেষজ্ঞরা। যেমন ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মহারাষ্ট্রে গত লোকসভা নির্বাচনের পর ভোটার বেড়েছিল ৫.৬%, অথচ কমিশন খসড়া তালিকা থেকে এক লাফে ২১% ভোটারের নাম কেটে দেয়। একইভাবে গুজরাটে ভোটার ৫.৫% বাড়লেও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ১৪% মানুষের নাম। তামিলনাড়ুতে ভোটার বৃদ্ধির হার ২.৬% হলেও সেখানে ১৫% ভোটারের নাম বাদ পড়ে। কেন্দ্রশাসিত চণ্ডীগড়ে ভোটার সংখ্যা আগে থেকেই ২৭% কমতির দিকে ছিল, সেখানে নির্বাচন কমিশন নতুন তালিকায় আরও ৪০% ভোটারকে ছেঁটে ফেলেছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও লোকসভা সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ হাজির করেছেন। মমতা দেখান, ২০২১ সালের নির্বাচনে কলকাতা জেলায় তৃণমূল ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৬৭৮ ভোটে জিতেছিল, অথচ এবার সেখানে একাই বাদ দেওয়া হয়েছে ৬ লাখ ৯৭ হাজার ১৬০ জনের নাম। উত্তর চব্বিশ পরগনায় তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান ছিল ৯ লাখ ১৩ হাজার ৯৪৩ ভোট, কিন্তু কমিশন সেখানে বাদ দিয়েছে ১২ লাখ ৬০ হাজার ৯৬ জন ভোটার। একইভাবে নদিয়ায় তৃণমূল ২০ হাজার ৯০৩ ভোটের ব্যবধানে জিতেছিল, আর সেখানে তালিকা থেকে কেটে ফেলা হয়েছে ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৫৬৫ জন ভোটারকে।

ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে নির্বাচন কমিশন এখন ব্লক লেভেল অফিসারদের (বিএলও) নির্দেশ দিয়েছে বাদ পড়া বাড়িগুলোতে সশরীরে গিয়ে ‘ফর্ম ৬’ পূরণ করাতে। অথচ এতদিন বিজেপি নেতারা প্রতিটি নির্বাচনে দাবি করতেন যে লাখ লাখ রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ভোটার তালিকায় ঢুকে পড়েছে। রাজনৈতিক প্রচারণায় তারা এই ইস্যুকে অস্ত্র বানালেও বাস্তবে নির্বাচন কমিশন আজ পর্যন্ত এই ১৩ কোটি মানুষের মধ্যে ঠিক কতজন তথাকথিত বিদেশি বা অনুপ্রবেশকারী ছিল, তার কোনো পরিষ্কার তথ্য দেশের সামনে তুলে ধরতে পারেনি। বিরোধী দলগুলো একে ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার এক বিপজ্জনক ষড়যন্ত্র বলে তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ