লিখিত ও ভাইভায় পাস করেও মিলল না চাকরি: ৪৫ বছর ভাড়া থেকেও স্থায়ী ঠিকানার গেরোয় আটকে ঝিনাইদহের মিশন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় শতভাগ মেধার প্রমাণ দিয়েছিলেন ঝিনাইদহের তরুণ মিশন আচার্য। এরপর চূড়ান্ত মৌখিক পরীক্ষাতেও তিনি সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। কিন্তু সব বাধা পেরোনোর পরও তাঁর হাতে নিয়োগপত্র ওঠেনি। কারণ হিসেবে দেখা গেছে এক অদ্ভুত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা—কর্তৃপক্ষ তাঁর স্থায়ী ঠিকানা যাচাই করতে পারেনি। অথচ ঝিনাইদহ পৌরসভার কলাবাগান এলাকায় তাঁর পরিবার টানা ৪৫ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করছে। নিজস্ব ভিটেমাটি না থাকায় এবং ভাড়া বাসায় থাকার কারণে মেধা তালিকায় এগিয়ে থেকেও এই যুবকের সরকারি চাকরির স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকায় স্থানীয় কদু মিয়ার প্রায় ৫০ বছর পুরোনো একটি আধাপাকা বাড়ির একটিমাত্র ঘরে গাদাগাদি করে বাস করেন ৭ সদস্যের এই পরিবার। পরিবারটির নুন আনতে পান্তা ফুরায়। বড় ভাই শৈলেন আচার্য মোড়ের মাথায় একটি ছোট্ট দোকানে পুরোনো কাপড় বিক্রি করেন। আর মা ময়না আচার্য মানুষের বাড়িতে ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিচারিকার কাজ করে সংসার টানেন। দুজনের এই সামান্য আয়, যা মাসে বড়জোর $৭০ থেকে $৮০ ডলার বা ৮ থেকে ৯ হাজার টাকার মতো, তা দিয়ে কোনোমতে আধপেটা খেয়ে তাঁদের দিন কাটে। ছোট ছেলে মিশন যখন মায়ের গর্ভে, তখনই তাঁর বাবা তাঁদের ফেলে চলে যান। সেই চরম দুর্দশার মধ্যেও মা অন্যের বাড়ি কাজ করে ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছেন।

দারিদ্র্যের শত বাধা সত্ত্বেও মিশন কখনো পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়েননি। তিনি শহরের কাঞ্চননগর মডেল স্কুল থেকে ২০১০ সালে বাণিজ্য বিভাগে জিপিএ-৫.০০ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। এরপর ২০১২ সালে শিশুকুঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে পান জিপিএ-৪.৮০। পরে মেধার জোরে ভর্তি হন কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে। সেখান থেকে ২০১৭ সালে স্নাতক এবং ২০১৮ সালে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। টিউশনি করে এবং ধারদেনা করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষ করেন পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায়।

মিশনের মা ময়না আচার্য বুকভাঙা কান্না চেপে বলেন, তাঁর বাবার বাড়ি ছিল মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার কাগজি পাড়া গ্রামে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর তাঁদের পুরো পরিবার ঝিনাইদহ শহরে এসে আশ্রয় নেয়। এরপর থেকে তাঁরা কলাবাগানের এই ভাড়া বাড়িতেই আছেন। পরিবারের সবাই এই এলাকার নিয়মিত ভোটার এবং তাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্রে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে কলাবাগানের কথাই লেখা রয়েছে। ময়না আচার্য আক্ষেপ করে বলেন, “এখানেই আমার বিয়ে হলো, দুই ছেলে জন্ম নিল, বড় হলো। জীবনের ৪৫টি বছর পার করলাম এই শহরে। অথচ নিজের এক টুকরো জমি নেই বলে আমার ছেলেটা সব পরীক্ষায় পাস করেও চাকরি পেল না? গরিব মানুষের কি স্থায়ী নাগরিক হওয়ার কোনো অধিকার নেই?”

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর পুলিশ ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) কর্মকর্তারা তাঁদের ভাড়া বাড়িতে গিয়ে তদন্ত করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র, নাগরিক সনদসহ সব ধরনের নথিপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে চূড়ান্ত সুপারিশের তালিকায় দেখা যায় মিশনের রোল নম্বরটি আর নেই। স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল হোসেন জানান, মিশন আচার্য এর আগেও দুই-তিনটি সরকারি চাকরির লিখিত ও ভাইভায় ১০০% উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই এই পুলিশ ভেরিফিকেশনে গিয়ে স্থায়ী ঠিকানার অজুহাতে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। জমি না থাকলে কি এ দেশের নাগরিক মেধা থাকা সত্ত্বেও সরকারি চাকরি পাবে না, এই প্রশ্ন এখন গোটা এলাকার মানুষের মুখে।

নিজের হতাশা প্রকাশ করে মিশন আচার্য বলেন, “আমি প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগের আবেদনপত্রে বর্তমান ও স্থায়ী দুই ঠিকানাতেই কলাবাগানের এই ভাড়া বাসার ঠিকানা দিয়েছি। আমার জীবনের সব চিঠি, ব্যাংকের কাগজপত্র ও প্রশংসাপত্র এই ঠিকানাতেই আসে। আমি এ দেশের বৈধ নাগরিক, আমার কোনো অপরাধ নেই। শুধু নিজের জমি নেই বলে আমাকে কেন প্রতিবার এভাবে ছিটকে যেতে হবে?” এ বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আমজাদ হোসেন জানান, তাঁরা ছেলেটিকে একেবারে বাদ দেননি। তাঁর বিশেষ এই পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। সেখান থেকে মানবিক দিক বিবেচনা করে দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ