গ্রাম বাংলার হারিয়ে যেতে বসা শত বছরের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখতে ঝিনাইদহের মহেশপুরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এক মনোমুগ্ধকর লাঠিখেলা প্রতিযোগিতা। উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের বকুলতলা বাজারে বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী এই বিশাল ফাইনাল খেলার চমৎকার আয়োজন করে গ্রামবাসী। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের যুগেও মাটির গন্ধমাখা এই লোকজ খেলা দেখতে ভোর থেকেই আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন নানা বয়সের হাজার হাজার নারী-পুরুষ। ৩২টি বাছাই করা লাঠিয়াল দলের দুর্দান্ত লড়াই, ছন্দময় শারীরিক কসরত আর লাঠির ঠোকাঠুকির তীব্র শব্দে দিনভর পুরো এলাকা উৎসবের রঙে মেতে ওঠে।
ফতেপুর গ্রামের লাঠিয়াল খেলা বাহিনী তাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ও শেকড়ের সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে রাখতে প্রতিবছরের মতো এবারও এই বর্ণাঢ্য আসর বসায়। ফতেপুর গ্রামের মরহুম নুর মোহাম্মদ ধাবকের সুযোগ্য উত্তরসূরি মোঃ আত্তাপ আলী ধাবকের দক্ষ পরিচালনায় খেলাটি শুরু হয়। ঢাক, ঢোল ও কাঁশির চেনা বাদ্যের তালে তালে অভিজ্ঞ লাঠিয়ালরা যখন লাঠি উঁচিয়ে ময়দানে নামেন, তখন দর্শকদের মুহুর্মুহু করতালিতে চারপাশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। বয়োবৃদ্ধ লাঠিয়ালদের নিখুঁত নৈপুণ্য এবং তরুণদের ক্ষিপ্র গতির প্যাঁচ উপস্থিত সবাইকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দারুণভাবে মুগ্ধ করে রাখে।
পুরো আয়োজন সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে স্থানীয় ৩০ থেকে ৪০ জন দায়িত্বশীল যুবকের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা কমিটি তৈরি করা হয়। খেলা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার খরচ মেটাতে গ্রামবাসী ও এলাকার বাইরে কর্মরত প্রবাসীরা প্রায় $৫০০ ডলারের আর্থিক অনুদান দেন। সেই সঙ্গে ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ সদস্যরাও শুরু থেকেই মাঠে শৃঙ্খলা রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করেন। মূল প্রতিযোগিতা শুরুর আগে ফতেপুর ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম এবং গ্রাম পুলিশ আবু তালেব লাঠিখেলার নানা ধরনের আত্মরক্ষামূলক প্যাঁচ ও কৌশল অত্যন্ত চমৎকারভাবে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন।
প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ৩২টি দল পর্যায়ক্রমে মাঠে নেমে তাদের লাঠির জাদু প্রদর্শন করে। ক্ষিপ্র গতিতে প্রতিপক্ষের লাঠির আঘাত প্রতিহত করা, চোখের পলকে নিজের অবস্থান বদলানো এবং বিদ্যুৎ গতিতে পালটা আঘাত হানার দৃশ্য দেখে দর্শকরা রোমাঞ্চিত হন। বকুলতলা বাজারের মাঠে কোনো ধরনের ফাঁকা জায়গা ছিল না। তীব্র রোদ উপেক্ষা করে উপস্থিত দর্শকদের প্রায় ৮০% মানুষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে প্রতিটি লড়াই উপভোগ করেন। উপস্থিত দর্শনার্থীরা জানান, ভিডিও গেমের এই যুগে এমন রোমাঞ্চকর লোকজ খেলা দেখে তারা শৈশবের সোনালী দিনগুলোতে ফিরে গেছেন।
খেলা শেষে এক প্রাণবন্ত আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ফতেপুর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোঃ মসলেম উদ্দিন শেখের আন্তরিক সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য তুলে ধরেন ফতেপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোঃ গোলাম ফারুক খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোঃ সেলিম রেজা, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ উমর আলী ভূঁইয়া, সিনিয়র সহসভাপতি মোঃ হাবিবুর রহমান হবি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মীর মোঃ কবীর হোসেন এবং স্থানীয় নেতা সজল মিয়া। পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় সঞ্চালনা করেন মহেশপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্যসচিব মোঃ কামরুজ্জামান বাবু।
প্রধান অতিথি ও অন্য বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা মানুষকে অপরাধ ও নানা অপকর্ম থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এক জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে গ্রামের প্রায় ৭০% কিশোর ও তরুণ অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে শারীরিক খেলাধুলা থেকে দূরে সরে গেছে। এই পরিস্থিতিতে যুবসমাজকে মাঠমুখী করতে এবং গ্রামীণ সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে এমন প্রতিযোগিতার গুরুত্ব অপরিসীম। বক্তারা আয়োজক কমিটির ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এই ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা আয়োজনের আশ্বাস দেন।
এই মেগা ফাইনালকে কেন্দ্র করে বকুলতলা বাজার ও এর সংযোগ সড়কগুলোতে এক বিশাল গ্রামীণ মেলার আবহ সৃষ্টি হয়। আশপাশের মিষ্টির দোকান, জিলাপির কড়াই আর শিশুদের মাটির খেলনার দোকানে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, এই উৎসবের কারণে তাদের স্বাভাবিক দিনের চেয়ে প্রায় ৬০% বেশি বেচাকেনা হয়েছে। গ্রামীণ ঐতিহ্যের এমন স্বতঃস্ফূর্ত পুনরুজ্জীবন প্রমাণ করে যে বাঙালি আজও তার শেকড়কে ভোলেনি। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই শতবর্ষী লাঠিখেলা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
















