মাঝআকাশে ফ্লাইদুবাইয়ের চালকের ওপর সহকারী পাইলটের হামলা, রক্ষা পেলেন ১৭৪ যাত্রী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দুবাই থেকে ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে মাঝআকাশে রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এফজেড১০৭ ফ্লাইটের প্রধান পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিথের ওপর হঠাৎ চড়াও হন তাঁরই সহকারী পাইলট। উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেটি ধ্বংস করাই হামলাকারীর মূল উদ্দেশ্য ছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। হাজার হাজার ফুট উঁচুতে এই অপ্রত্যাশিত হামলায় বিমানের সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে ককপিটে রক্তারক্তি শুরু হতেই কয়েকজন সাহসী যাত্রী ভেতরে ঢুকে সহকারী পাইলটকে জাপটে ধরে নিরস্ত্র করেন। পরে উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করলে বিমানে থাকা ১৭৪ জন যাত্রী নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানান, অভিযুক্ত এই সহকারী পাইলট মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানের নাগরিক। তিনি মাত্র ৮ মাস আগে দুবাইভিত্তিক বিমান সংস্থা ফ্লাইদুবাইয়ে চাকরিতে যোগ দেন। উড়োজাহাজটি আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় ওই সহ-পাইলট একটি ধারালো কুঠার দিয়ে প্রধান ক্যাপ্টেনের ওপর উপর্যুপরি আঘাত করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ককপিটের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি পুরোপুরি অচল করে দিয়ে বিমানের গতিপথ নষ্ট করা। তবে ওমানের সাথে ইসরায়েলের কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকায় এই পাইলট কীভাবে তেলআবিবগামী ফ্লাইটে দায়িত্ব পেলেন, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

ভয়ংকর এই বিপদের মুখে ককপিটের দরজা খোলা পেয়ে সরাসরি ভেতরে ছুটে যান ইয়ানিভ হায়ুন নামের এক যাত্রী। পেশায় পানির পাইপ মিস্ত্রি বা প্লাম্বার এই সাহসী ব্যক্তি হামলাকারীকে আটকাতে নিজের জীবন বাজি রাখেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন আসাফ রাজুয়ান নামের আরেক ইসরায়েলি যাত্রীসহ অন্তত পাঁচজন সাধারণ আরোহী। আসাফ রাজুয়ান জানান, ককপিটে ঢুকে তাঁরা খুব দ্রুতই আক্রমণকারীকে মাটিতে চেপে ধরেন। তিনি বলেন, ককপিটে কোনো বড় ধরনের মারামারি হয়নি, বরং সহযাত্রীদের সম্মিলিত শক্তিতে চোখের পলকেই হামলাকারীকে পুরোপুরি কাবু করা সম্ভব হয়।

রক্তাক্ত শরীরে তীব্র যন্ত্রণা নিয়েও অসীম সাহসিকতায় উড়োজাহাজের ভারসাম্য ধরে রাখেন ক্যাপ্টেন স্মিথ। ক্যাপ্টেনের শরীর থেকে রক্ত ঝরলেও তিনি এক মুহূর্তের জন্যও মনোবল হারাননি এবং অসীম দক্ষতায় বিমানটি নিয়ন্ত্রণে রাখেন। উড়োজাহাজটি তখন জর্ডানের আকাশসীমায় অবস্থান করছিল। কোনো কালবিলম্ব না করে তিনি সৌদি আরবের আকাশসীমায় ঢোকার অনুমতি চান এবং তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি সংকেত পাঠান। সৌদির বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক রানওয়ে ফাঁকা করে দিলে সফলভাবে উড়োজাহাজটি মাটিতে নামে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, দ্রুততম সময়ে জরুরি অবতরণ সম্ভব না হলে বিমানের ১০০% আরোহীই ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হতে পারতেন। মাটিতে নামার পরপরই সৌদি পুলিশ হামলাকারীকে হাতকড়া পরায়।

তাবুক বিমানবন্দরে যাত্রীরা আটকা পড়ার পর ইসরায়েল নিজ দেশের নাগরিকদের ফিরিয়ে আনতে বিশেষ সামরিক বিমান পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক না থাকায় সৌদি আরব ইসরায়েলি বিমান নামার সেই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেয়। পরবর্তীতে গতকাল বুধবার ফ্লাইদুবাইয়ের পাঠানো একটি বিকল্প ফ্লাইটে করে সব যাত্রীকে নিরাপদে তেলআবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে পৌঁছে দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী বর্তমানে আটক ওমানি পাইলটকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

হামলার আগে বিমান নিয়ে এমন কোনো গোয়েন্দা তথ্য ইসরায়েলের কাছে ছিল কি না, তা নিয়ে নেতানিয়াহুকে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে তিনি জানান, ইরানের সমর্থিত গোষ্ঠী হামাস কিংবা হিজবুল্লাহ বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলিদের ওপর হামলা চালাতে পারে—এমন সাধারণ শঙ্কা সবসময়ই থাকে। তবে এই নির্দিষ্ট ফ্লাইট নিয়ে তাঁদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো সতর্কবার্তা ছিল না। বিশ্বজুড়ে উড়োজাহাজের ককপিট সুরক্ষা ও পাইলটদের মানসিক মূল্যায়নে এয়ারলাইনগুলো প্রতি বছর কোটি কোটি $ ডলার ব্যয় করে। এত সতর্কতার পরও কীভাবে একজন ব্যক্তি কুঠার নিয়ে ককপিটে ঢুকলেন, তা নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তুলেছে।

সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ওই সহ-পাইলটকে খুব দ্রুত সংযুক্ত আরব আমিরাতে হস্তান্তর করা হতে পারে। আমিরাত সরকারের নেতৃত্বে শুরু হতে যাওয়া এই আন্তর্জাতিক তদন্তে ইসরায়েলের গোয়েন্দারাও যুক্ত থাকবেন বলে জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। তবে হামলাকারীর পেছনে কোনো সন্ত্রাসী চক্র কাজ করেছে নাকি তিনি ব্যক্তিগত কোনো ক্ষোভ থেকে এমন উন্মত্ত কাণ্ড ঘটিয়েছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে তদন্তকারী দল ককপিটের ভয়েস রেকর্ডার ও ডিজিটাল ডেটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ