১০০ টাকায় মাংস-ভাত থেকে কোটি ভিউ: দ্বিতীয়বার উচ্ছেদ হলেন আগারগাঁওয়ের ‘ভাইরাল মিজান’

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রাজধানীর আগারগাঁওয়ের তালতলার ফুটপাতে চুলা জ্বালিয়ে রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মিজান। তখন ঠিক মঙ্গলবার দুপুর ১২টা। হঠাৎ দলবল নিয়ে হাজির হয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ উচ্ছেদকারী দল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় তাঁর রান্নার চুলা ও স্তূপ করে রাখা জ্বালানি কাঠ। মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো উচ্ছেদের মুখে পড়লেন তিনি। ফুটপাত দখলের দায়ে এর আগে জেলও খেটেছেন। তবে জেল থেকে বেরিয়ে গলায় ফুলের মালা পরে ফুটপাতে ফেরার পর তিনি আর সাধারণ হকার থাকেননি; হয়ে উঠেছেন সামাজিক মাধ্যমের ‘ভাইরাল মিজান’।

কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিজ্ঞাপন ছাড়াই মিজানের এমন পরিচিতির পেছনে রয়েছে স্মার্টফোনের ক্যামেরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর চুলার পাশে ভিড় জমান ইউটিউব, ফেসবুক ও টিকটকের শত শত কনটেন্ট নির্মাতা। স্যুট-টাই পরে ‘জাকির জ্যাক’দের মতো নির্মাতারা দোকানের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইভ করেন। কারণ একটাই মিজানকে নিয়ে বানানো ভিডিও মানেই লাখ লাখ ভিউ আর ঘরে বসে শত শত ডলার ($) আয়ের সুযোগ। ক্যামেরার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মিজান প্রায়ই গালিগালাজ করেন। দর্শকেরা তাঁর এই রাগকেই বেশি পছন্দ করেন, যা ভিডিওর কাটতি বাড়িয়ে দেয় অন্তত ৫০% বেশি।

ভিডিওর বাইরে মিজানের জনপ্রিয়তার মূল কারণ গরুর মাংসের চড়া দাম ও নিম্নবিত্তের খাদ্যের হাহাকার। ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালেও রাজধানীতে প্রতি কেজি গরুর মাংস ছিল ৩০০ টাকা। বর্তমানে টিসিবির হিসাবে তা ১৮০% বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকায়। আশপাশের রেস্তোরাঁয় মাংস দিয়ে পেট ভরে ভাত খেতে খরচ পড়ে কমপক্ষে ২৫০ টাকা। সেখানে মিজান এক বাটি মাংসসহ ভাত তুলে দেন মাত্র ১০০ টাকায়। ফলে স্বল্প আয়ের দিনমজুর ও রিকশাচালকদের কাছে তিনি সেলিব্রিটি নন, বরং কম খরচে পেট ভরার বড় আশ্রয়।

মিজানের জীবনের শুরুটা ছিল বেশ কষ্টের। ছোটবেলায় চরম অভাবের মধ্যে মায়ের হাত ধরে বরিশালের গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন তিনি। তালতলায় বড় হওয়া মিজান দেখেছেন মায়ের হাড়ভাঙা খাটুনি। মা মানুষের বাসায় কাজ করতেন, পোশাক কারখানায় খেটেছেন এবং ফুটপাতে ভাত বিক্রি করে সংসার টেনেছেন। মায়ের হাত ধরেই শ্রমের জগতে নামেন মিজান। দীর্ঘদিন রিকশা চালিয়েছেন, ফুটপাতে ছিল তাঁর রিকশার গ্যারেজ। বছর দুয়েক আগে সেই ফুটপাতেই ভাতের ব্যবসা শুরু করেন। ক্রেতাদের ফোনের ক্যামেরায় ভর করেই শুরু হয় তাঁর ভাইরাল জীবনের নতুন গল্প।

কিন্তু ফুটপাতের এই ব্যবসা তাঁকে আইনি ঝামেলায় ফেলে। গত ৯ আগস্ট বিদ্যুৎ সংযোগ কাটার সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়ানোয় তাঁকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর ১৬ আগস্ট প্রথম দফায় তাঁর দোকান গুঁড়িয়ে দেয় সিটি করপোরেশন। কিন্তু ২৩ আগস্ট কারামুক্তির পর ঘটে নাটকীয় ঘটনা। একদল মানুষ ফুলের মালা পরিয়ে তাঁকে বীরের বেশে বরণ করে নেন। ফেসবুকে তাঁর মুক্তির একটি ভিডিও প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বা ১৩ মিলিয়নের বেশি মানুষ দেখেন। এই দৃশ্য তাঁকে ইন্টারনেটে এক অপরাজেয় চরিত্র বানিয়ে দেয়।

কারাগার থেকে ফেরার পর মিজানের হোটেলে ক্রেতাদের ভিড় আরও বাড়ে। উচ্ছেদের আগের দিন তিনি জানান, প্রথমবার দোকান ভাঙার আগে দিনে ৮০ থেকে ৯০ কেজি চাল রান্না হতো। আর ভাইরাল হওয়ার পর সেই বিক্রি বেড়ে দাঁড়ায় ১২০ কেজিতে। সিটি করপোরেশনের অভিযানের ভয় থাকলেও ক্রেতাদের চাপে তিনি বারবার ফুটপাতে ফিরে আসেন। ফুটপাত দখল করে চলাচলে বিঘ্ন ঘটানো বেআইনি হলেও মিজানের প্রতি সাধারণ মানুষের এই সমর্থন প্রশাসনকেও একধরনের জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।

গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ফাহমিদুল হকের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিউ মিজানের জন্য এক ধরনের সামাজিক পুঁজি তৈরি করেছে, যা তাঁকে বারবার ফুটপাতে ফেরার সাহস জুগিয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, সোশ্যাল মিডিয়ার সস্তা জনপ্রিয়তা ফুটপাত দখলের স্থায়ী সমাধান বা ন্যায্যতা হতে পারে না। ফেসবুকের অ্যালগরিদম শুধু মানুষের আবেগ বেচে ডলার ($) কামায়, নীতি বিচার করে না। তাই কেবল উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে লাভ নেই; দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে নিম্নবিত্ত মানুষের খাবারের অধিকার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ