একসময় বয়ঃসন্ধি মানেই ছিল দুরন্ত কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পা রাখার একটি স্বাভাবিক অধ্যায়। তবে বর্তমান সময়ে অনেক শিশুর শরীরেই সেই পরিবর্তনগুলো খুব দ্রুত ফুটে উঠছে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি যেখানে কৈশোরের শেষে বয়ঃসন্ধি শুরু হতো, সেখানে ১৯৬০-এর দশকে ছেলেদের ক্ষেত্রে গড় বয়স ছিল ১৫ বছর। আধুনিক যুগে এই বয়স নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। এখন মেয়েদের ৮ থেকে ৯ বছর এবং ছেলেদের ৯ থেকে ১০ বছর বয়সেই এই পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন অভিভাবকরা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিসংখ্যান বলছে, ১৮৫০ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত সময়ে মেয়েদের প্রথম ঋতুস্রাবের বয়স প্রতি দশকে প্রায় ৪ মাস করে কমেছে। চিকিৎসকদের মতে, মেয়েদের ৮ আর ছেলেদের ৯ বছরের আগেই শারীরিক পরিবর্তন শুরু হলে তাকে অকাল বয়ঃসন্ধি বলে।
হঠাৎ কেন এই অকাল পরিবর্তন ঘটছে? বিশেষজ্ঞরা জানান, এর পেছনে কোনো একক কারণ নেই। তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে শিশুদের অতিরিক্ত ওজন ও চর্বি। গত কয়েক দশকে বিশ্বজুড়ে স্থূল শিশুর সংখ্যা প্রায় ৫০% পর্যন্ত বেড়ে গেছে। শরীরে মেদ জমলে ‘লেপটিন’ নামের একটি হরমোন দ্রুত বাড়ে। এই হরমোন মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে সংকেত পাঠিয়ে শরীরকে দ্রুত পরিপক্ব করে তোলে। অতিরিক্ত ওজনের কারণে মেয়েদের ১২ বছর হওয়ার আগেই ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ বাড়ে। একইভাবে অতিরিক্ত চর্বির জন্য ছেলেদের ক্ষেত্রেও খুব অল্প বয়সে প্রজনন অঙ্গের দ্রুত বৃদ্ধি ও শারীরিক পরিবর্তন ঘটে।
শিশুদের অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসও এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি দায়ী। এখনকার বাচ্চারা ঘরে তৈরি সাধারণ খাবারের চেয়ে ফাস্টফুড, চিপস ও কোমল পানীয় বেশি পছন্দ করে। বহু পরিবার প্রতি মাসে শত শত $ (ডলার) সমমূল্যের প্যাকেটজাত প্রক্রিয়াজাত খাবারের পেছনে টাকা ঢালছেন। এসব খাবার শিশুদের মেটাবলিজম ও হরমোনের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে দেয়। এছাড়া অনেক শিশুই সকালে নাশতা না খেয়ে স্কুলে যায় এবং বিকেলে একসঙ্গে প্রচুর ভাজাপোড়া খায়। চিকিৎসকদের মতে, এই অনিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস শরীরে ক্ষতিকর চর্বি বাড়িয়ে দিয়ে হরমোনের ক্ষরণ ত্বরান্বিত করে।
আরেকটি বড় সংকট তৈরি করেছে স্মার্টফোন ও কম্পিউটারের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। শিশুরা এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনে চোখ আটকে রাখছে। বিশেষ করে রাতে স্ক্রিনের নীল আলো চোখের ক্ষতি করে এবং ‘মেলাটোনিন’ নামের ঘুম সহায়ক হরমোন নিঃসরণ প্রায় ৬০% পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। ঠিকমতো ঘুম না হলে শিশুর স্বাভাবিক হরমোন ভারসাম্য থাকে না। এছাড়া মাঠে গিয়ে খেলার বদলে ঘরে বসে ডিভাইস ব্যবহারের কারণে তাদের শারীরিক পরিশ্রম একেবারে বন্ধ হয়ে যায়, যা তাদের মেদ বাড়াতে সাহায্য করে।
আমাদের ব্যবহৃত নিত্যদিনের জিনিসপত্রে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিকও বড় বিপদ ডাকছে। শিশুদের খেলনা, পানির বোতল, টিফিন বক্স ও খাবারের প্যাকেটে বিপিএ এবং থ্যালেটের মতো রাসায়নিক থাকে। এমনকি প্রসাধনীতেও প্যারাবেন মেশানো হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান এগুলোকে ‘এন্ডোক্রাইন-ডিসরাপ্টিং কেমিক্যাল’ বলে। এসব রাসায়নিক শরীরে ঢুকে প্রাকৃতিক হরমোনের কাজে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে অপরিণত শরীরও সময়ের আগেই বড় হয়ে ওঠার ভুল সংকেত পেয়ে দ্রুত শারীরিক রূপান্তর ঘটাতে শুরু করে।
শিশুর মানসিক চাপকেও এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী করছেন চিকিৎসকরা। পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষায় ভালো করার পারিবারিক তাগিদ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ শিশুর মনে স্থায়ী উদ্বেগ তৈরি করে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপে থাকলে শিশুর অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে বেশি মাত্রায় কর্টিসল হরমোন বের হয়। এই অতিরিক্ত হরমোন ভেতরের শারীরিক বিকাশকে দ্রুত উসকে দিয়ে সময়ের আগেই পূর্ণতা আনে। ফলে বয়সের আগেই শিশুর শরীর অস্বাভাবিক দ্রুততায় রূপ নিতে থাকে।
সময়ের আগেই শরীর বড় হয়ে যাওয়া শিশুর জন্য কোনো সুখবর নয়, বরং এটি তাদের মানসিক জগতে বিপর্যয় ডেকে আনে। সমবয়সীদের চেয়ে আলাদা হয়ে যাওয়ায় শিশু লজ্জা পায় এবং নিজেকে গুটিয়ে নেয়। ভবিষ্যতে তাদের হাড়ের বৃদ্ধি দ্রুত থমকে গিয়ে উচ্চতা স্থায়ীভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। তাই পরিবারের সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। মেয়েদের ৮ আর ছেলেদের ৯ বছরের আগেই কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখলে লজ্জা না পেয়ে সরাসরি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যান। সচেতনতা ও ভালোবাসা দিয়ে শিশুকে একটি সুস্থ শৈশব উপহার দেওয়া সম্ভব।















