রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত পুরোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠ থেকে ২০টিরও বেশি তাজা ককটেল এবং শক্তিশালী পেট্রলবোমা উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আজ সোমবার বিকেলে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে এসব মারাত্মক ও বিপজ্জনক বিস্ফোরক উদ্ধার করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে ঘটনার পরপরই পুলিশ ও বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা পুরো মাঠসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো ঘিরে ফেলেন। এরপর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অভিজ্ঞ বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার করা ককটেল ও পেট্রলবোমাগুলো নিষ্ক্রিয় করার কাজ শুরু করে।
বিস্ফোরক উদ্ধারের এই চাঞ্চল্যকর বিষয়টি সরাসরি নিশ্চিত করেছেন এসআরবি-২-এর দায়িত্বশীল কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার নিফাজ রহমান। তিনি সাংবাদিকদের জানান, সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে একটি নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা সূত্রের মাধ্যমে তাঁরা জানতে পারেন যে সাবেক বাণিজ্য মেলার নির্জন মাঠে নাশকতার জন্য বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে এসআরবির একটি চৌকস দল বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে মাঠের উত্তর-পশ্চিম কোণের ঝোপঝাড়ের মধ্যে চিরুনি তল্লাশি চালায়। সেখানে পরিত্যক্ত অবস্থায় লাল স্কচটেপ দিয়ে শক্ত করে মোড়ানো তাজা ককটেল ও কাচের বোতলে তৈরি বেশ কয়েকটি পেট্রলবোমা পাওয়া যায়। তবে অভিযানকারীদের উপস্থিতি টের পেয়ে দুর্বৃত্তরা আগেই সটকে পড়ে।
খবর পেয়ে বিকেলে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ভারী সুরক্ষামূলক বর্ম ও বিশেষ যন্ত্রপাতি নিয়ে মাঠে প্রবেশ করে। তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিশেষ ড্রাম এবং বালির বস্তা ব্যবহার করে বিস্ফোরকগুলো একটি একটি করে নিস্ক্রিয় করতে শুরু করে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরকের মধ্যে ইতিমধ্যে প্রায় ৬০% ককটেল নিরাপদ পদ্ধতিতে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। বাকি বিস্ফোরকগুলো পরীক্ষা করে নিষ্ক্রিয় করার জোর চেষ্টা চলছে। বোমা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি ককটেলই ছিল অত্যন্ত মারাত্মক এবং এগুলো ব্যস্ত রাস্তায় ফাটলে জানমালের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারত।
পুরোনো বাণিজ্য মেলার এই মাঠটি রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রের অত্যন্ত ব্যস্ত ও স্পর্শকাতর এক এলাকায় অবস্থিত। এর মাত্র ১ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদ ভবন, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও ঢাকা শিশু হাসপাতাল। এছাড়া প্রতিদিন এই মাঠের সীমানা ঘেঁষে হাজার হাজার মানুষ ও ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচল করে। এমন এক সংবেদনশীল স্থানে একসঙ্গে ২০টির বেশি তাজা বোমা মজুদের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় দোকানি ও সাধারণ পথচারীদের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই ভয়ে মাঠের আশপাশের ফুটপাত ছেড়ে দ্রুত নিরাপদ দূরত্বে সরে যান।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করছেন, রাজধানীতে হঠাৎ করে বড় ধরনের নাশকতা চালিয়ে জনমনে ভীতি সৃষ্টি করতেই কোনো রাজনৈতিক বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এই চক্রান্ত করেছিল। খুব সামান্য খরচে, মাত্র ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ টাকা বা প্রায় $৩০ থেকে $৩৫ ডলার ব্যয়ে এসব দেশি প্রযুক্তির হাতে তৈরি ককটেল বানিয়ে তারা মাঠে জমা করেছিল। মাঠের ফাঁকা জায়গাটিকে তারা নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছিল। উদ্ধার করা এসব বিস্ফোরক কোথা থেকে এল এবং কারা এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে, তা উদ্ঘাটন করতে শেরেবাংলা নগর এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সব সিসিটিভি ক্যামেরার প্রায় ১০০ ঘণ্টার ফুটেজ সংগ্রহ করে গভীর বিশ্লেষণ করছে পুলিশ।
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার পর পুরো শেরেবাংলা নগর, আগারগাঁও ও সংলগ্ন মোহাম্মদপুর এলাকায় কড়া নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিশেষ আর্মড ফোর্স মোতায়েন রয়েছে। থানা-পুলিশ জানিয়েছে, নাশকতার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আজই একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। রাজধানীজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে পুলিশ ১০০% প্রস্তুত রয়েছে বলে আশ্বস্ত করেছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে কোনো স্থানে পরিত্যক্ত ব্যাগ, প্যাকেট বা সন্দেহজনক কোনো বস্তু চোখে পড়লে হাত না দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ যোগাযোগ করার জন্য সাধারণ নাগরিকদের বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
















