রাজধানীর মিরপুর–১ নম্বরে সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ৫০ বছরের পুরোনো ভরসাস্থল ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার’ এক্সক্যাভেটর দিয়ে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন মুখোশধারী ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এই বর্বরোচিত হামলা চালায়। তারা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দুই নিরাপত্তাকর্মীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ভবনের ভেতরে থাকা প্রয়োজনীয় ওষুধ, বহুমূল্য চিকিৎসা সরঞ্জাম ও টিকা লুট করে নেয়। এরপর একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবন মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে জায়গাটি দখলের চেষ্টা করে।
স্থানীয় লোকজন ও আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, হামলার মূল পরিকল্পনা ও লোক জড়ো করার কাজটি পরিচালনা করেন স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা। বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ৫ মিনিটে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়ার দলীয় কার্যালয়ের সামনে দুর্বৃত্তরা জড়ো হয়। সেখান থেকে তারা ছিন্নমূল মার্কেটের পাশ থেকে রামদা, হাতুড়ি ও লোহার রড সংগ্রহ করে। ভাঙচুর চালানোর সময় হানিফ মিয়া, লেলিন এবং যুবদল নেতা মোস্তফা জগলুল পাশা পাপেল একটি সাদা মাইক্রোবাসে চড়ে ঘটনাস্থলে দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বহু দিন ধরে এই সরকারি জমি দখলের পাঁয়তারা করছিল ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’। এই সমিতির সঙ্গে যুক্ত গাজী শাহ আলম ও আবদুর রহিম হাজরা একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভোল পাল্টে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় আসেন। হামলা পরিচালনাকারী নেতারা সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও রাজনৈতিক অনুসারী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তবে সংসদ সদস্য দাবি করেছেন, তিনি ২০০৬ সালে শুধু সুপারিশ করেছিলেন, এই জঘন্য হামলার সঙ্গে তাঁর কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই।
হামলার সময় শাহ আলী থানা-পুলিশের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। খবর পেয়ে রাতেই শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম পুলিশ দল নিয়ে উপস্থিত হলেও হামলাকারীদের থামানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেননি। উল্টো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তিনি জানান, জায়গাটির বৈধ মালিকেরা নাকি দখল বুঝে নিচ্ছেন। এমনকি তিনি দখলদারদের একজনের সঙ্গে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোনে সরাসরি কথা বলিয়ে দেন। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওসিকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করেছে। সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট জানান, এই ঘটনায় ১০০% দায়ীদের শাস্তি পেতে হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে বিভাগীয় ব্যবস্থা শুরু হয়েছে।
দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পুলিশ এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, আটক হওয়া প্রথম চার তরুণকে মাত্র ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা বা প্রায় $৮ থেকে $১০ ডলারের বিনিময়ে ভাঙচুরের জন্য ভাড়া করা হয়েছিল। পরে গোয়েন্দা পুলিশ শাহবাগ ও শাহ আলী এলাকা থেকে আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। এ ছাড়া দারুসসালামের বেড়িবাঁধ থেকে লুট হওয়া ৪৬ ধরনের মালামাল, চিকিৎসা রেজিস্টার খাতা, দামি আল্ট্রাসনোগ্রাম যন্ত্রাংশ এবং দুটি কাভার্ড ভ্যান উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
১৯৭৪ সাল থেকে চলা এই দাতব্য প্রতিষ্ঠানটি গুঁড়িয়ে দেওয়ায় মিরপুরের হাজার হাজার দরিদ্র প্রসূতি মা ও শিশুরা চরম বিপদে পড়েছেন। ধ্বংসস্তূপের সামনে খোলা আকাশের নিচে বসে কর্মীরা সীমিত পরিসরে সেবা দিচ্ছেন। গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাস্তার ওপর বসেই অন্তত ৩৭টি শিশুকে হামের টিকা এবং অর্ধশতাধিক প্রসূতি নারীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল ইসলাম এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানান। চিকিৎসা নিতে এসে ধ্বংসস্তূপ দেখে অশ্রুসজল চোখে ফিরে যাচ্ছিলেন মনোয়ারা বেগম। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের মতো গরিব মায়েরা এখন কোথায় যাবে?”
















