অহংকার ও আত্মোপলব্ধির সংকট: ইবলিসের পতন থেকে মানুষের জন্য চিরন্তন শিক্ষা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট হলো নিজেকে সঠিকভাবে না চেনা। ধর্মগ্রন্থের পাতায় ইবলিসের পতনের যে ইতিহাস আমরা পাই, তা মূলত মানব মনের গভীর মনস্তত্ত্বের এক চিরন্তন দর্পণ। ইবলিস জানত স্রষ্টা এক, সে সরাসরি কথা বলেছে, বেহেশত ও দোজখের বাস্তবতা নিজের চোখে দেখেছে। এমনকি অগাধ জ্ঞানের কারণে সে ফেরেশতাদের শিক্ষক হিসেবেও মর্যাদা পেয়েছিল। তার প্রার্থনায় কোনো দৃশ্যমান ঘাটতি ছিল না। কিন্তু এত কিছুর পরও তার শুধু একটিমাত্র জিনিসের বড় অভাব ছিল; সে নিজেকে বিনয়ের মাপকাঠিতে চিনতে পারেনি।

স্রষ্টা যখন তাকে আদম (আ.)-কে সম্মান জানাতে বললেন, তখন সে নির্দেশ অমান্য করল। স্রষ্টা তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমাকে কিসে বাধা দিল?’ এই প্রশ্নের অর্থ ছিল ভেতরের কোন অদৃশ্য বিষ তোমাকে আনুগত্য থেকে দূরে সরিয়ে দিল? সেই প্রধান বাধাটি ছিল তার অন্ধ অহমিকা, যার প্রকাশ ঘটেছিল তার মুখে ‘আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ’। সে যুক্তি দিয়েছিল যে সে আগুনের তৈরি আর আদম মাটির। কিন্তু তার মনের আসল ব্যাধি ছিল নিজের তৈরি করা তথাকথিত ভিআইপি ভাবমূর্তি। সে ভেবেছিল, তার এত বছরের সাধনা তাকে বিশেষ আসনে বসিয়েছে, তাই সে কেন মাটির মানুষের সামনে মাথা নত করবে।

মানব ইতিহাসে এই আত্মম্ভরিতাই সবচেয়ে বড় ধ্বংস ডেকে এনেছে। আধ্যাত্মিক আদালতের নিয়ম বড় অদ্ভুত; সেখানে নিজেকে বড় ভাবলে পতন অনিবার্য, আর বিনয়ী হলে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। বর্তমান সমাজেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পারিবারিক ও কর্মক্ষেত্রের প্রায় ৮০% থেকে ৮৫% দ্বন্দ্বের মূলে থাকে এই ‘আমিই সেরা’ মানসিকতা। সামান্য ১% অহংকারও মানুষের দীর্ঘদিনের ভালো কাজ ও সুনামকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। মানুষ যখন নিজের মর্যাদা নিয়ে অতিরিক্ত অন্ধ হয়ে যায়, তখন সে সত্যের পথ থেকে দূরে সরে যায়।

ইবলিসের চূড়ান্ত ধ্বংস ডেকে এনেছিল ভুল স্বীকার না করার গোঁড়ামি। ভুল করার পর সে তওবা করেনি, বরং নিজের ভুলের পক্ষে সাফাই গেয়েছে। প্রথমে সে আদম (আ.)-কে দায়ী করল, আর পরে ধৃষ্টতা দেখিয়ে স্রষ্টাকে দোষারোপ করে বসল। এখানেই আদম (আ.) এবং ইবলিসের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয়। আদম (আ.) ভুল বুঝতে পেরে কোনো অজুহাত না দিয়ে সরাসরি বলেছিলেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি।’ একজন নিজের ভুলের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হলেন, আর অন্যজন অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে চিরতরে পথভ্রষ্ট হলো।

ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনেও এই নীতি সমভাবে প্রযোজ্য। কর্মক্ষেত্রে বা ব্যবসায় কোনো ভুলের দায় স্বীকার না করার কারণে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি $ (ডলার) ক্ষতি হয়। মানুষ যখন সম্পর্কের জটিলতায় পড়ে, তখন আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার পরিবর্তে নানা যুক্তি দিয়ে নিজের অন্যায় ঢাকতে চায়। সমাজের প্রায় ৯০% মানুষ অন্যের দিকে আঙুল তুলতে যতটা তৎপর, নিজের ভুল দেখতে ততটাই উদাসীন। অথচ নিজের ত্রুটি অকপটে মেনে নেওয়াই হলো প্রকৃত সংশোধনের একমাত্র উপায়।

ইবলিস আসলে কোনো দূরবর্তী চরিত্র নয়, সে মানুষের মনের ভেতরে থাকা অন্ধ আত্মম্ভরিতার রূপক। যখনই কেউ বলে ‘আমি সবসময় সঠিক, অপরপক্ষ ভুল’, ‘পরিস্থিতি খারাপ ছিল বলেই আমি এমন আচরণ করতে বাধ্য হয়েছি’, কিংবা ‘আমি সবার চেয়ে বেশি বুঝি’ তখন বুঝতে হবে ভেতরে সেই পুরনো অহংকারই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। অহংকারী মনোভাব চায় মানুষ যেন কখনোই নিজের ভুল না দেখে। কারণ যে নিজের দোষ স্বীকার করে না, সে কখনোই অনুতপ্ত হয় না, আর অনুতাপহীন মানুষ কখনো সত্যের পথে ফিরতে পারে না।

তাই জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে নিজের দিকে আত্মসমালোচনার দৃষ্টি দেওয়া দরকার। হৃদয়ের গহিনে লুকিয়ে থাকা ‘আমিই সেরা’ ভাবটিকে চিহ্নিত করে নির্মূল করাই মানবিকতার আসল পরীক্ষা। এই অহমিকাকে বশে রাখতে পারলেই মানুষ প্রকৃত সৃষ্টির সেরা হতে পারে; আর একে লালন করলে মানুষ নিজ হাতেই নিজের সর্বনাশ ডেকে আনে। দিনশেষে অন্যকে কাঠগড়ায় না তুলে নিজের ভুল স্বীকারের মানসিকতাই একজন মানুষকে সমাজে চিরস্মরণীয় ও মর্যাদাবান করে তোলে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ