যুক্তরাজ্যে মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলার ছক নস্যাৎ: আটক ৫, বাড়িঘর খালি করে কড়া নিরাপত্তা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় বিমান হামলা চালাতে ব্যবহৃত যুক্তরাজ্যের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল মার্কিন বিমানঘাঁটিতে বড় ধরণের নাশকতার পরিকল্পনা নস্যাৎ করেছে ব্রিটিশ পুলিশ। রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে ইংল্যান্ডের গ্লস্টারশায়ারে অবস্থিত আরএএফ ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটির দিকে তিনটি সন্দেহজনক ভ্যান দ্রুতগতিতে যাওয়ার সময় সশস্ত্র পুলিশ ৫ জন ব্যক্তিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ ঘাঁটির চারপাশের ৪০০ মিটার এলাকা তাৎক্ষণিকভাবে ফাঁকা করে ফেলে। একই সঙ্গে কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিয়ে আশপাশের গ্রামের অন্তত ৮৫টি বাড়ির বাসিন্দাদের নিরাপদে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এই নাটকীয় গ্রেপ্তারের ঘটনায় স্বস্তি ও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের বলেন, আটক ব্যক্তিরা সামরিক বিমানঘাঁটির অপূরণীয় ও বড় ধরনের ক্ষতি করার গভীর ষড়যন্ত্র করছিলেন। ট্রাম্প আরও বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের এই যৌথ অভিযান ছিল সত্যি অসাধারণ ও নিখুঁত। আমরা তাঁদের গতিবিধির ওপর দীর্ঘ সময় ধরে নজর রাখছিলাম এবং শেষ পর্যন্ত তাঁদের ধরতে পেরেছি।’ ট্রাম্প দাবি করেন, ব্রিটিশ ও মার্কিন গোয়েন্দাদের যৌথ তৎপরতায় ঘাঁটিটির প্রায় শতভাগ (১০০%) নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে এবং কয়েক মিলিয়ন $ (ডলার) মূল্যের ক্ষতি এড়ানো গেছে।

ব্রিটিশ কাউন্টার টেররিজম বা সন্ত্রাসবাদবিরোধী বিশেষ গোয়েন্দা ইউনিট পুরো ঘটনার তদন্তে নেতৃত্ব দিচ্ছে। কাউন্টার টেররিজম পুলিশের জ্যেষ্ঠ জাতীয় সমন্বয়কারী ভিকি ইভান্স জানান, একটি জরুরি ফোনের সূত্র ধরে সশস্ত্র পুলিশ সদস্যরা দ্রুত অভিযান পরিচালনা করেন। আটক হওয়া ৫ জনকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সন্দেহে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এদিকে ব্রিটিশ গণমাধ্যম ডেইলি মেইলের ওয়েবসাইটে আটক ৫ জন শার্টবিহীন যুবকের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে সেনাবাহিনীর বিশেষ বোমা নিষ্ক্রিয়কারী ইউনিট জব্দ করা তিনটি ভ্যানে বিস্ফোরক রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখছে।

ঘটনার আকস্মিকতায় রবিবার ভোররাতে বিমানঘাঁটির নিকটবর্তী গ্রামের বাসিন্দাদের ঘুম ভাঙিয়ে জরুরিভিত্তিতে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘাঁটির প্রধান ফটকসহ আশপাশের সব সংযোগ সড়কে সাঁজোয়া যান ও ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ব্যারিকেড গড়ে তোলে নিরাপত্তা বাহিনী। গ্লস্টারশায়ার পুলিশের সহকারী প্রধান কনস্টেবল রিচার্ড ওকোনে সাংবাদিকদের বলেন, বড় ধরনের জাতীয় সংকট মোকাবিলায় জরুরি বাহিনীর সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা রয়েছে। ড্রোন প্রতিরোধী নানা আধুনিক প্রযুক্তি মোতায়েনের পাশাপাশি আকাশ ও স্থলপথে সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিটি সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে একের পর এক আক্রমণ চালানো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রকে এই ঘাঁটি ব্যবহারের বিশেষ অনুমতি দেয় ব্রিটেন। এখান থেকেই মার্কিন দূরপাল্লার বোমারু বিমানগুলো নিয়মিত উড্ডয়ন করছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে, ইরানের ওপর হামলা চালাতে ব্যবহৃত যেকোনো বিদেশি সামরিক ঘাঁটি তাদের কাছে সরাসরি ও শতভাগ বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।

ফেয়ারফোর্ডে হামলার চেষ্টার পরপরই যুক্তরাজ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য সামরিক ঘাঁটিতেও সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব ইংল্যান্ডের সাফোক অঞ্চলে অবস্থিত বিখ্যাত আরএএফ লেকেনহিথ ঘাঁটির প্রবেশমুখে অতিরিক্ত সাঁজোয়া যান ও সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। মার্কিন বিমানবাহিনীর ৫০১তম কমব্যাট সাপোর্ট উইংয়ের এক মুখপাত্র বলেন, তাদের সামরিক সদস্য, বেসামরিক কর্মী এবং তাদের পরিবারের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ ৫০% থেকে ৬০% পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তিনি জানান, সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়মিত পর্যালোচনা করে ঘাঁটির সুরক্ষা প্রটোকলে প্রয়োজনীয় রদবদল আনা হচ্ছে।

অন্যদিকে ব্রিটিশ গোয়েন্দারা এই ঘটনার পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক মহলের পরোক্ষ ইন্ধন রয়েছে কি না, তাও গভীরভাবে খতিয়ে দেখছেন। এর আগে ব্রিটিশ মন্ত্রীরা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনাগুলোতে সাইবার হামলা ও নাশকতার বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করেছিলেন। পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে বারবার ছায়াযুদ্ধ বা হাইব্রিড হামলার অভিযোগ তোলা হলেও বৈরী দেশগুলো সবসময় তা অস্বীকার করে আসছে। তবে চলমান বৈশ্বিক সংঘাতের মধ্যে কৌশলগত বিমানঘাঁটিগুলোর ওপর সার্বিক নজরদারি আগের চেয়ে অনেক বাড়ানো হয়েছে।

ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, দেশের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামকে এই স্পর্শকাতর পরিস্থিতির প্রতিটি মুহূর্তের হালনাগাদ তথ্য নিয়মিত জানানো হচ্ছে। এর আগে ২০২৫ সালের জুনে মধ্য ইংল্যান্ডের একটি বিমানঘাঁটিতে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ গোষ্ঠীর সদস্যরা জোরপূর্বক ঢুকে পড়লে সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না এবং বিমানঘাঁটির সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত রাখতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ