রবার্তো মানচিনির হাত ধরে ইউরো জয়ের সেই সোনালী স্মৃতি এখনো ইতালিয়ান সমর্থকদের মনে উজ্জ্বল। কিন্তু আজ্জুরিদের ডাগআউটে তাঁর দ্বিতীয় দফার প্রত্যাবর্তন রূপ নিল এক গভীর দুঃস্বপ্নে। ঘরের মাঠে উয়েফা নেশনস লিগের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে বেলজিয়ামের কাছে ২-০ গোলে অসহায়ভাবে হেরে গেছে ইতালি। তরুণ উইঙ্গার মিকা গোডটস এবং দোদি লুকেবাকিওর নিখুঁত দুটি গোল স্তব্ধ করে দিয়েছে স্বাগতিক দর্শকদের। ফ্রান্স ও তুরস্কের মতো শক্তিশালী দল নিয়ে গঠিত এই কঠিন গ্রুপে শুরুতেই বড় ধাক্কা খেয়ে বিপাকে পড়ল চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। নেশনস লিগের নতুন মৌসুমের প্রথম ম্যাচেই এমন শোচনীয় পরাজয় কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না ক্ষুব্ধ সমর্থকেরা।
২০২৩ সালে নাটকীয়ভাবে দায়িত্ব ছেড়ে যাওয়ার পর আবারও জাতীয় দলের হাল ধরেছেন মানচিনি। তবে প্রত্যাবর্তনের রাতে শুরু থেকেই ভাগ্য সহায় ছিল না তাঁর। কার্ডের নিষেধাজ্ঞায় নিয়মিত ডিফেন্ডার আলেসান্দ্রো বাস্তোনি দলের বাইরে ছিলেন। চোটের কারণে স্কোয়াড থেকে ছিটকে যান ফেদেরিকো দিমারকো, মার্কো পালেস্ত্রা, ব্রায়ান ক্রিস্তান্তে ও নিকোলো জানিওলো। বাধ্য হয়ে আর্সেনালের রিকার্দো কালাফিওরিকে লেফট ব্যাকে নামান কোচ। অভিষেক করান সুইজারল্যান্ডের বদলে ইতালিকে বেছে নেওয়া তরুণ আলেসান্দ্রো রোমানোকে। অন্যদিকে বেলজিয়ামের ডাগআউটেও নতুন কোচ হিসেবে যাত্রা শুরু করেন সাবেক ডাচ তারকা মার্ক ফন বোমেল। থিবো কোর্তোয়া, জেরেমি ডোকু ও ত্রসারকে ছাড়াই শক্তিশালী একাদশ নামায় বেলজিয়াম।
ম্যাচ শুরুর মাত্র ৭ মিনিটের মাথায় বেলজিয়ামের আক্রমণের মুখে পড়ে ইতালি। শার্ল দে কেতেলারের জোরালো কোণাকুণি শট বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে এক হাতে আটকে দেন গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মা। কিছুক্ষণ পর নিকোলো বারেল্লার পাসে ফ্রাঞ্চেস্কো পিয়ো এসপোশিতোর শট বারে লেগে ফিরে এলেও রেফারি অফসাইডের বাঁশি বাজান। এরপর খেলার ধারার বিপরীতে মারাত্মক ভুল করে বসে স্বাগতিক রক্ষণভাগ। অভিষিক্ত রোমানোর এক ভুল পাস কেড়ে নেন কেভিন ডি ব্রুইনা। তিনি দ্রুত বল বাড়ান গোডটসকে। ডি-বক্সে ঢুকে অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার জিয়ানলুকা মানচিনিকে ছিটকে ফেলে কাছের পোস্ট দিয়ে বল জালে জড়িয়ে বেলজিয়ামকে ১-০ গোলে এগিয়ে দেন গোডটস।
গোল খেয়ে হতভম্ব ইতালি রক্ষণ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল। প্রায় ৫০ $ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের তারকা গোলরক্ষক দোন্নারুম্মা পোস্টের নিচে প্রাচীর হয়ে না দাঁড়ালে প্রথমার্ধেই ম্যাচ থেকে ছিটকে যেত ইতালি। কোপ্পোলার বাজে ব্যাকপাস থেকে দে কেতেলারে ও নিকোলাস রাসকিনের একের পর এক আক্রমণ অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেন দোন্নারুম্মা। গোডটসের একটি নিশ্চিত হেডার এবং বাঁকানো শট বাইরে পাঠিয়ে প্রথমার্ধে ব্যবধান বাড়তে দেননি তিনি। বিশ্বমানের গোলকিপিং দিয়ে তিনি দলকে লড়াইয়ে টিকিয়ে রাখেন।
বিরতির পর ম্যাচে ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে ইতালি। আক্রমণের ধার বাড়িয়ে কামবিয়াগির ক্রসে ছয় গজ দূর থেকে মোইজে কিন দুর্দান্ত এক ভলি করেন। কিন্তু বেলজিয়ান গোলরক্ষক সেন লামেন্স অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় তা ঠেকিয়ে দেন। এস্পোসিতোর ফিরতি শটও রুখে দাঁড়ান লামেন্স। ইতালি যখন সমতায় ফিরতে সব শক্তি দিয়ে চাপ তৈরি করছিল, ঠিক তখনই প্রতি-আক্রমণ থেকে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন দোদি লুকেবাকিও। নিজেদের অর্ধ থেকে একাই বল টেনে নিয়ে গিয়ে বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের চোখধাঁধানো শটে বল জালে জড়িয়ে ব্যবধান ২-০ করেন তিনি।
ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে শেষ দিকে মোমো জোমা ও ইসা দৌম্বিয়াকে মাঠে নামান মানচিনি। আজ্জুরিরা প্রায় ৫৮% বলের দখল রাখলেও দুর্বল ফিনিশিংয়ের কারণে গোলের দেখা পায়নি। ফ্রাত্তেসির চিপ অল্পের জন্য বাইরে যায় এবং কালাফিওরির শটও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে জর্জিও স্কালভিনির খুব কাছ থেকে নেওয়া বুলেট গতির শট ক্রসবারে লেগে ফিরে এলে ইতালির ম্যাচে ফেরার সব আশা শেষ হয়ে যায়। একের পর এক সুযোগ নষ্ট করে চরম মূল্য দিতে হলো তাদের।
রেফারির শেষ বাঁশির পরও মাঠের উত্তাপ বিন্দুমাত্র কমেনি। কথা-কাটাকাটিতে জড়িয়ে পড়েন ইতালির গোলরক্ষক দোন্নারুম্মা ও বেলজিয়ান স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু। দুজনের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দিলে রেফারি ছুটে এসে উভয়কেই হলুদ কার্ড দেখান। ঘরের মাঠে এমন বাজে হার দিয়ে অভিযান শুরু করায় মানচিনির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বড় ধাক্কা খেল। গ্রুপে টিকে থাকতে হলে ইতালিকে সামনের ম্যাচগুলোতে শতভাগ তথা ১০০% উজাড় করে খেলতে হবে।
















