রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর পথনকশা তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ১১ নম্বর কক্ষে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে তিনি যুগান্তকারী পাঁচ দফা প্রস্তাব পেশ করেন। বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, অনির্দিষ্টকালের জন্য একা বাংলাদেশের পক্ষে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভার বহন করা সম্ভব নয়।
সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থাপিত ৫ দফা প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের সমন্বয়ে দ্রুত প্রত্যাবাসনের বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করা, মিয়ানমারের ভেতরে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টি করা, বেসামরিক জনগণের ওপর সব ধরনের বর্বর সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করা, শরণার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত মানবিক ফান্ড নিশ্চিত করা, এবং আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে আন্তসীমান্ত অপরাধ দমনে কার্যকর সহযোগিতা বাড়ানো। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের জন্ম হয়েছে মিয়ানমারে, তাই এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারের ভেতরেই খুঁজতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন যে, দীর্ঘ ৯ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। ১৯৭৮ সাল ও ১৯৮০-এর দশকে কয়েক দফায় রোহিঙ্গা এলেও ২০১৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়ে যায়। তিনি জানান, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রতি বছর হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে, যার ফলে গড়ে উঠছে বাস্তুচ্যুত এক নতুন প্রজন্ম। মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে বাংলাদেশ শিবিরগুলোতে প্রায় ৬,০০০ শিক্ষাকেন্দ্রে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিশুদের পড়াশোনা এবং তরুণদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, যাতে তারা রাখাইনে ফিরে স্বাভাবিক জীবনে যুক্ত হতে পারে।
তবে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠী ও পরিবেশের ওপর অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে বলে তিনি সতর্ক করেন। বনভূমি ধ্বংসের পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমবাজারে প্রায় ২৫% থেকে ৩০% বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এছাড়া যুবসমাজের দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশার কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মাদক পাচার, অস্ত্র চোরাচালান এবং অবৈধ মানব পাচারের মতো আন্তদেশীয় অপরাধ মারাত্মক রূপ নিচ্ছে। জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষ ট্রলারে চড়ে উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছে। একটি দেশের অমীমাংসিত সংকট পুরো অঞ্চলের জন্যই মারাত্মক নিরাপত্তা হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মানবিক সহায়তার তীব্র ঘাটতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্যাম্পগুলোতে প্রয়োজন বাড়লেও আন্তর্জাতিক সহায়তার তহবিল উল্টো দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (জেআরপি) যেখানে $৯৩৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তার লক্ষ্যমাত্রা ছিল, সেখানে ২০২৬ সালে তা প্রায় ২৪% কমিয়ে মাত্র $৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, এই সীমিত অর্থ দিয়ে কেবল নূন্যতম জীবন বাঁচিয়ে রাখার মতো খাবার ও ওষুধ জোগান দেওয়া সম্ভব। কেবল আর্থিক সহায়তার উদারতা দেখিয়ে বিশ্বনেতারা নিজেদের রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা আড়াল করতে পারেন না।
রাখাইনের মাঠপর্যায়ের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানকার রোহিঙ্গারা এখনো নির্বিচার আটক, জোরপূর্বক শ্রম ও চলাচলের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি উভয় পক্ষের সহিংসতায় সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে। ফলে সেখানে প্রত্যাবাসনের মতো নিরাপদ কোনো পরিবেশ এখনো গড়ে ওঠেনি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি কেবল মৌখিক সহমর্মিতা না দেখিয়ে তাদের নিজ ভূমিতে অধিকার ফিরিয়ে দিতে এখন বিশ্ববাসীকে কার্যকর ও সাহসী রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
উচ্চপর্যায়ের এই বিশেষ বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন গাম্বিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মেদ বি এস জ্যালো, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহ এবং পুরো অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন রাষ্ট্রদূত আইরিন খান। সমাপনীতে বক্তারা অবিলম্বে রাখাইনে সামরিক নিপীড়ন বন্ধ এবং আইসিজেতে বিচারাধীন রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার দ্রুত চূড়ান্ত নিষ্পত্তির প্রতি জোর সমর্থন ব্যক্ত করেন।
















