ঝিনাইদহে সাড়ে তিন বছরের শিশু সাবা হত্যা মামলায় প্রতিবেশী নারীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ শহরের পবহাটি গ্রামের বহুল আলোচিত সাড়ে তিন বছরের ফুটফুটে শিশু সাইমা আক্তার সাবা হত্যা মামলায় একমাত্র নারী আসামি শান্তনা খাতুনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে বিচারক আসামিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঝিনাইদহের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ১ম আদালতের বিচারক মোহা: হেলাল উদ্দীন জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। শিশু হত্যার মতো বর্বরোচিত ঘটনার দ্রুত বিচার পেয়ে আদালতে উপস্থিত স্বজন ও সাধারণ মানুষ সন্তোষ প্রকাশ করেন।

মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর সকালে পবহাটি গ্রামের বাসিন্দা সাইদুল ইসলামের ছোট্ট মেয়ে সাইমা আক্তার সাবা বাড়ির উঠানে খেলতে গিয়ে হঠাৎ নিখোঁজ হয়। পরিবারের সদস্যরা আশপাশের বাড়িঘর, ঝোপঝাড় ও এলাকার বিভিন্ন পুকুরে খোঁজাখুঁজি করেও শিশুটির কোনো সন্ধান পাননি। কোনো উপায় না পেয়ে মেয়ের নিখোঁজের ঘটনায় বাবা সাইদুল ইসলাম ঝিনাইদহ সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন দিনভর জোর তল্লাশি শুরু করেন।

দিনভর নিখোঁজ থাকার পর ওই দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে সন্দেহবশত একই গ্রামের প্রতিবেশী আক্তারুজ্জামান মাসুমের ঘরে তল্লাশি চালায় পুলিশ। তল্লাশির একপর্যায়ে মাসুমের স্ত্রী শান্তনা খাতুনের ঘরের ভেতর থেকে শিশু সাবার নিথর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে শান্তনাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে এবং হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ পেয়ে তাকে গ্রেপ্তার দেখায়। নিষ্পাপ এই শিশুকে এমন নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় তখন পুরো ঝিনাইদহ শহরে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছিল।

ঘটনার পর ঝিনাইদহ সদর থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) মনোজ কুমার ঘোষ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত সম্পন্ন করেন। ঘটনার মাত্র ২৭ দিনের মাথায় ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি আদালতে মোট ২৭ জন সাক্ষীর নাম উল্লেখ করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। গ্রেপ্তার শান্তনা খাতুন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তিনি জানান, ঘটনার দিন তার ছেলে আবু জুবায়েরের সঙ্গে খেলাধুলা নিয়ে সাবার ঝগড়া হয়। তখন রাগের মাথায় তিনি সাবার মাথায় সজোরে আঘাত করেন। এতে ঘটনাস্থলেই শিশুটির মৃত্যু হলে লাশ নিজের ঘরে লুকিয়ে রাখেন।

বিচারিক কার্যক্রমে আদালত অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে মাত্র ৮ কার্যদিবসের মধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষ করেন। বাংলাদেশে সাধারণত ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে প্রায় ৮০% থেকে ৮৫% মামলাই দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। সেখানে একটি চাঞ্চল্যকর শিশু হত্যা মামলার বিচার এত অল্প সময়ে শেষ হওয়া বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা ১০০% পেশাদারিত্ব ও নিখুঁত সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে আসামির অপরাধ আদালতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হন।

মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট এস এম মশিউর রহমান ও অতিরিক্ত পিপি কাজী একরামুল হক আলম দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন রাষ্ট্র কর্তৃক নিযুক্ত আইনজীবী অ্যাডভোকেট আশরাফ জোয়ার্দ্দার। শুনানিকালে আইনজীবীরা বলেন, আদালত যে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় $১৬৫ ডলারের সমান, তা ন্যায়বিচারের পাশাপাশি সমাজের অপরাধীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। শিশু সুরক্ষায় আইনের এমন কঠোর প্রয়োগ সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

রায়ের পর কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত শিশু সাবার বাবা সাইদুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমার সাড়ে তিন বছরের মেয়েকে তো আর ফিরে পাব না, তবে হত্যাকারীর সাজা হওয়ায় আমাদের বুকের ক্ষত কিছুটা হলেও শান্ত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সমাজে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং শিশু নির্যাতনের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে এমন দ্রুত রায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো, অপরাধী নারী হোক বা পুরুষ, আইনের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সম্পর্কিত নিবন্ধ