জুলাই সনদে সই করা দলগুলোর সঙ্গে সংসদীয় কমিটির বৈঠক আজ: বয়কটের পথে বিরোধী দল

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতাদের সঙ্গে আজ রোববার গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় বৈঠকে বসছে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। বেলা ২:৩০টায় জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে কমিটির এই দ্বিতীয় বৈঠক শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে জুলাই সনদে সই করা ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ের মোট ৫২ জন প্রতিনিধিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে সরকারি দলের এই উদ্যোগে শুরুতেই বড় ধাক্কা লেগেছে। কারণ প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের শরিক দলগুলো এই মতবিনিময় বৈঠক পুরোপুরি বর্জন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে জাতীয় ঐক্যের প্রক্রিয়া শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

এর আগে গত ৪ আগস্ট বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী ও জ্যেষ্ঠ সম্পাদকদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বসার সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্তের আলোকেই আজকের এই সভার আয়োজন। মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত রূপ পায়। শেষ পর্যন্ত বাম ধারার ৪টি দল সই না করায় বাকি ২৬টি দল ও জোট এতে স্বাক্ষর করে। ওই সনদের মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাবই সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, যা পুরো সনদের প্রায় ৫৭% বা অর্ধেকেরও বেশি।

সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেছিল। সংসদ নির্বাচনের দিনই এ নিয়ে দেশব্যাপী ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়। গণভোটের স্পষ্ট রায় অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যদের নিয়ে একটি সার্বভৌম ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে যাবতীয় কাজ শেষ করার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর সেই সংস্কার পরিষদ গঠন করেনি এবং তাদের সংসদ সদস্যরাও এ সংক্রান্ত কোনো শপথ নেননি। এর ফলে শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে সরকার ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক মতভেদ তৈরি হয়।

সংস্কার পরিষদ গঠনের পরিবর্তে গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে প্রধান করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে সরকার। ওই কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য ৫টি পদ বা প্রায় ৪২% আসন বরাদ্দ রেখে নাম চাওয়া হয়েছিল। তবে গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে গঠিত এই কমিটিকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে শুরু থেকেই তা প্রত্যাখ্যান করে বিরোধী দল। সরকারি দল আশা করেছিল বিরোধীরা শেষ পর্যন্ত নমনীয় হবে, কিন্তু বিরোধীরা তাদের দাবিতে অটল রইল। ফলে গত ১০ সেপ্টেম্বর সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষ হলেও বিরোধী দল সেখানে কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি। বিরোধীদের এই অনড় অবস্থানের মধ্যেই এখন একতরফাভাবে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি।

১১-দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু জানিয়েছেন, তারা সংসদীয় কমিটির আমন্ত্রণ পেলেও বৈঠকে না যাওয়ার বিষয়ে অটল রয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে অনুমোদিত গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করাই ছিল সরকারের একমাত্র দায়িত্ব। সেটা না করে দলীয় সংসদীয় কমিটি গঠন করা জনগণের রায়ের প্রতি সুস্পষ্ট অবমাননা। একইভাবে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, কোনো প্রথাগত বা দলকানা পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধন করলে চলমান জাতীয় রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান মিলবে না। সংস্কার পরিষদ নিয়ে কোনো ফলপ্রসূ উদ্যোগ ছাড়া তারা এই প্রক্রিয়ায় পা বাড়াবেন না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিরোধী দলগুলোকে বাইরে রেখে একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধনের পথে হাঁটলে দেশে নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ ও শত শত কোটি ডলারের ($) আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টিও দেশের রাজনৈতিক ঐক্যের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। জুলাই সনদে সই করা ২৬টি দলের মধ্যে অন্তত ৮টি দল সরাসরি বিরোধীদের এই জোটে রয়েছে। ফলে তাদের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিতে আজকের এই মতবিনিময় সভা কার্যত কতটা গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর হবে, তা নিয়ে নানা মহলে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ