র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন পরিচয়ে কাজ শুরু করেছে বাহিনীটির সবকটি ইউনিট। বুধবার সকাল থেকেই সারা দেশে র্যাবের পুরোনো নাম ও পরিচয় বদলে এসআরবি হিসেবে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম চালাচ্ছেন সদস্যরা। এতদিন সাংবাদিকদের কাছে অভিযানের খবর ও তথ্য পাঠানোর জন্য যেসব বার্তা গ্রুপ ব্যবহার করা হতো, সেগুলোর নাম পরিবর্তন করে এসআরবি রাখা হয়েছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাহিনীর ফেসবুক পেজের নাম বদলানো হয়েছে এবং লোগোতে ইংরেজি ‘RAB’ অক্ষরের জায়গায় বসানো হয়েছে ‘SRB’। তবে লোগোর সামগ্রিক নকশা আগের মতোই অপরিবর্তিত রয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার সরকার ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর গেজেট আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করে। সংসদে বিরোধী দলের তুমুল আপত্তির মুখে গত ১০ সেপ্টেম্বর আলোচিত এই বিলটি পাস হয়েছিল। নতুন আইনে র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে এসআরবি নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের স্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। তবে বাস্তবে র্যাবও এতদিন কাগজে-কলমে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনেই পরিচালিত হতো। ফলে নতুন আইন কার্যকর হলেও বাহিনীর মূল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও কার্যপদ্ধতিতে কার্যত কোনো তফাত দেখছেন না আইন বিশেষজ্ঞরা।
নতুন এই আইনের মাধ্যমে র্যাবের প্রায় ১০০% জনবল, আইনি ক্ষমতা, অস্ত্রাগার, তহবিল ও সম্পদ সরাসরি এসআরবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। বাহিনীর ব্যাংক হিসাব, স্থাবর সম্পদ এবং পূর্বে স্বাক্ষরিত সব ধরনের চুক্তিও নতুন ইউনিটের অধীনে চলে গেছে। র্যাবের জন্য বিভিন্ন সময়ে কেনা কোটি কোটি $ ডলার মূল্যের আধুনিক নজরদারি সরঞ্জাম, অস্ত্র ও যানবাহন নতুন নামে ব্যবহারের ফলে সরকারের নতুন কেনাকাটার প্রয়োজন পড়ছে না। একই সাথে রেজিস্টার ও হিসাবের যাবতীয় নথি এসআরবিতে ন্যস্ত হয়েছে। সদস্যদের বিরুদ্ধে চলমান বিভাগীয় ব্যবস্থা বা আদালতের বিচারিক কার্যক্রমও আগের মতোই বহাল থাকবে।
র্যাবের মূল বিতর্কের জায়গা ছিল নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার করা। মানবাধিকারকর্মী এবং গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের পক্ষ থেকে বারবার তাগিদ ছিল, কোনো বিশেষায়িত বাহিনী করা হলে তাতে যেন শুধুই নিয়মিত পুলিশ সদস্যদের রাখা হয়। কিন্তু নতুন আইনেও সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাদের এসআরবিতে প্রেষণে পদায়নের পুরোনো সুযোগ রাখা হয়েছে। অথচ ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিএনপি সংবাদ সম্মেলন করে বাহিনীটি সংস্কারের বদলে পুরোপুরি বিলুপ্তির স্পষ্ট দাবি তুলেছিল। এখন একই কাঠামো ধরে রাখায় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে।
সংসদে বিলটি পাসের আলোচনায় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষের দাবি ছিল বাহিনীটি বিলুপ্ত করার, কিন্তু সরকার একই কাঠামো রেখে শুধু সাইনবোর্ড বদলে দিয়েছে। তিনি বিশেষায়িত বাহিনীর যৌক্তিকতা ব্যাখ্যার দাবি জানান। এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মেনেই র্যাব বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং এসআরবির সঙ্গে পুরোনো বাহিনীর সম্পর্ক নেই। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, কেনাকাটার বিপুল ব্যয় এড়াতেই র্যাবের বিদ্যমান সব সম্পদ নতুন ইউনিটে ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর র্যাব এবং এর শীর্ষ সাত কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বাহিনীটি বন্ধের সুপারিশ করে আসছিল। আইন পাশের পর বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান বলেন, পুরোনো কাঠামো টিকিয়ে রেখে শুধু নাম বা ইউনিফর্ম বদলে কোনো কাঙ্ক্ষিত সমাধান মিলবে না। প্রয়োজনে পুলিশের মধ্য থেকেই বিশেষ দল গঠন করে উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া যেত। কিন্তু সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বেসামরিক পুলিশিংয়ে রেখে দিলে মৌলিক কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।
আইনে নাগরিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য অভ্যন্তরীণ একটি প্রতিকার কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে, যার সভাপতি হবেন বাহিনীর একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক। তবে স্বাধীন কোনো তদারকি ছাড়া এই কমিটি কতটা নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবে, তা নিয়ে নাগরিক সমাজের গভীর সংশয় রয়েছে। পুরোনো কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে নতুন নামে যাত্রা শুরু করা এসআরবি জনআস্থা কতটা ফেরাতে পারবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
















