এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় চমৎকার সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে চট্টগ্রামে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো ‘শিখো-প্রথম আলো জিপিএ-৫ সংবর্ধনা’। রবিবার সকাল থেকেই চট্টগ্রামের ফয়’স লেক অ্যামিউজমেন্ট পার্কে জড়ো হতে শুরু করে কৃতী শিক্ষার্থীরা। ‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে আয়োজিত এই মিলনমেলায় অংশ নেয় প্রায় সাড়ে ছয় হাজার শিক্ষার্থী। পার্কের প্রবেশদ্বার খোলার সাথে সাথেই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে তারা। অনেকে বন্ধুদের নিয়ে পার্কের বিভিন্ন রাইডে চড়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে, আবার অনেকে সেলফি বুথের সামনে দাঁড়িয়ে ফ্রেমবন্দি করে জীবনের সোনালী এই মুহূর্তটি। চট্টগ্রাম পর্বের মধ্য দিয়েই সারা দেশের ৬৪টি জেলায় এই মেধার উৎসবের যাত্রা শুরু হলো।
বেলা দুইটায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। অনুষ্ঠানে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, মানুষের প্রতিটি সৎ স্বপ্নই একেকটি এভারেস্ট শৃঙ্গের মতো। আর জীবনের সেই এভারেস্ট জয় করতে হলে নিয়মিত পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞানের বই পড়তে হবে। তিনি বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন ও তাঁর মায়ের অসীম বিশ্বাসের গল্প তুলে ধরে বলেন, মা-বাবা এবং শিক্ষকদের আত্মত্যাগের কারণেই সন্তানরা সফল হতে পারে। তাই পরিবারের প্রতি আজীবন শ্রদ্ধাশীল ও সুশৃঙ্খল থাকতে হবে।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মিথ্যা, মাদক ও মুখস্থ বিদ্যাকে চিরতরে ‘না’ বলার দৃপ্ত শপথ পাঠ করান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরী। এরপর বক্তব্য দেন এভারেস্টজয়ী দুই নির্ভীক পর্বতারোহী এম এ মুহিত ও বাবর আলী। তাঁরা প্রতিকূল পথ পাড়ি দিয়ে চূড়ায় ওঠার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যপূরণে অবিচল থাকার তাগিদ দেন। এছাড়া পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ‘শিখো’র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীর চৌধুরী এবং মেন্টররা বলেন, মাধ্যমিকে ভালো ফল কেবল প্রথম ধাপ। উচ্চমাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিযুদ্ধে দেশের সেরা ৫% আসনের মধ্যে জায়গা করে নিতে হলে এখন থেকেই প্রতিদিন নিয়মিত পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
সংবর্ধনায় অংশ নিয়ে নিজের স্বপ্নের কথা জানায় বাংলাদেশ মহিলা সমিতি উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী তাসফিয়া জান্নাত। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে তাসফিয়া বলে, তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন একজন ভালো চিকিৎসক হয়ে দেশের প্রান্তিক মানুষের সেবা করা। এই ধরনের অনুষ্ঠান তরুণদের মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং বড় হওয়ার প্রেরণা জোগায়। শুধু তাসফিয়া নয়, অনুষ্ঠানে আগত শত শত শিক্ষার্থীর চোখেমুখে ছিল চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবক হয়ে দেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়। সন্তানদের এই ঐতিহাসিক অর্জনে পাশে থাকা অভিভাবকদের মধ্যেও দেখা যায় গভীর তৃপ্তি ও আনন্দাশ্রু।
বক্তারা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ইতিবাচক রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে আধুনিক অ্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই জটিল বিষয়গুলো সহজে আয়ত্ত করতে পারছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষা খাতে যেভাবে বিলিয়ন ডলারের ($) আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হচ্ছে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদেরও সেই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। অতিথিরা জানান, নিয়মিত কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অন্তত ৯০% বাধা অনায়াসে দূর করা সম্ভব। তাই ফলাফল ভালো হওয়ার আনন্দে আত্মতুষ্টিতে না ভুগে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন থেকেই আত্মনিয়োগ করতে হবে।
বিকেলের নরম আলোয় শুরু হয় সাংস্কৃতিক ও আনন্দ পর্ব। মঞ্চে এসে আলো ছড়ান জনপ্রিয় অভিনেতা খায়রুল বাসার, তৌসিফ মাহবুব ও অভিনেত্রী কেয়া পায়েল। প্রিয় তারকাদের সরাসরি সামনে পেয়ে করতালিতে ফেটে পড়ে উপস্থিত তরুণরা। তারকারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রাণবন্ত আড্ডায় মেতে ওঠেন এবং তাঁদের পড়াশোনা ও শুটিংয়ের নানা মজাদার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ১০ জন মেধাবীর হাতে আকর্ষণীয় পুরস্কার তুলে দেন আমন্ত্রিত অতিথিরা। জাদুশিল্পী রাজীব বসাকের চোখধাঁধানো জাদু প্রদর্শনী পুরো মাঠকে বিস্ময়ে মাতিয়ে তোলে।
অনুষ্ঠানের শেষ ভাগে মঞ্চে আসেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী তানভীর ইভান। তিনি তাঁর জনপ্রিয় গান ‘আকাশ’ পরিবেশন করলে পুরো ফয়’স লেক জুড়ে সমবেত কণ্ঠে সুর মেলায় হাজারো শিক্ষার্থী। সুরের মায়াজালে আনন্দ দ্বিগুণ করে দেয় জনপ্রিয় ব্যান্ড তিরন্দাজ। তরুণদের উদ্দীপনামূলক এই বিশাল আয়োজনে মূল সহযোগী ছিল বিকাশ, কনকর্ড গ্রুপ, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান। রঙিন বেলুন উড়িয়ে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সেরা মানুষ হওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে শেষ হয় চট্টগ্রামের এই মহোৎসব।
















