দেশজুড়ে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় ঝিনাইদহের শৈলকুপায় নেওয়া হয়েছে বিশেষ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। উপজেলা প্রশাসন ও শৈলকুপা পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে এক সাঁড়াশি পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়। এডিস মশার বংশবিস্তার পুরোপুরি ঠেকানো এবং সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ উপহার দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চত্বরকে কেন্দ্র করে এই অভিযান শুরু হলেও পুরো শহরজুড়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধের এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শনিবার সকাল ৯টার দিকে শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে থেকে এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। অভিযানে সরাসরি মাঠে থেকে নেতৃত্ব দেন শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাশেদ আল মামুন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আব্দুল্লাহ মামুন এবং উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সুলতান আহমেদ। এছাড়া পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী, স্থানীয় সংবাদকর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রায় ৫০ জন প্রতিনিধি এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
অভিযান চলাকালে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এই সরকারি হাসপাতালের পুরো চত্বর ঘুরে দেখেন কর্মকর্তারা। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা হাসপাতালের চারপাশের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ঝোপঝাড় কেটে পরিষ্কার করেন। ড্রেনের জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করে সেখানে মশা মারার ওষুধ ও ব্লিচিং পাউডার ছিটানো হয়। বিশেষ করে হাসপাতালের পেছনের খোলা জায়গায় পড়ে থাকা ডাবের খোসা, ওয়ান-টাইম কাপ এবং ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করা হয়। পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা শাখা জানায়, শহর থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ থেকে ৩ টন বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্য নিয়ে তারা কাজ করছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রাশেদ আল মামুন জানান, ডেঙ্গু রোগীর প্রায় ৭০% থেকে ৮০% সংক্রমণের শিকার হন অসচেতনতার কারণে। এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার ও স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। তিনি বলেন, হাসপাতালে প্রতিদিন শত শত সাধারণ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। তাই হাসপাতাল এলাকাকে সবার আগে ১০০% মশামুক্ত রাখা জরুরি। আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আব্দুল্লাহ মামুন স্থানীয়দের পরামর্শ দেন, জ্বর হলে কোনো অবহেলা না করে সরকারি হাসপাতালে মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকার ফি দিয়ে ডেঙ্গুর রক্ত পরীক্ষা করানো উচিত। সময়মতো শনাক্ত হলে ডেঙ্গু থেকে দ্রুত সুস্থ হওয়া সম্ভব।
অভিযান তদারকি শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কেবল এক দিনের লোকদেখানো কর্মসূচি করলে চলবে না। প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১ দিন পুরো উপজেলায় নিয়মিত এই বিশেষ অভিযান চালানো হবে। পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজার এবং সরকারি দপ্তরগুলোর চারপাশে নিয়মিত মশার লার্ভা মারার ওষুধ ছিটানো হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান বা বাসাবাড়িতে পানি জমিয়ে রেখে মশার প্রজনন ঘটালে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সুলতান আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমাজের সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। উপজেলার শতাধিক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হবে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের পড়ার ঘর ও বাড়ির আঙিনা সপ্তাহে অন্তত ৩ দিন ভালো করে পর্যবেক্ষণ করবে। প্রতিটি শিশু যদি তার পরিবারকে জমানো পানি ফেলে দেওয়ার বিষয়ে সচেতন করতে পারে, তবে শৈলকুপা থেকে ডেঙ্গুর ঝুঁকি প্রায় ৯০% কমে আসবে।
বক্তারা অনুষ্ঠানে সমবেত সবার উদ্দেশে বলেন, ডেঙ্গুর মতো ঘাতক ব্যাধি রুখতে সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যক্তি সচেতনতা সবচেয়ে বেশি দরকার। প্রতিটি বাড়ির ছাদবাগান, ফুলের টব ও ফ্রিজের পেছনের ট্রে নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে পৌর এলাকার সর্বত্র নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কারের দাবি জানান। শৈলকুপাকে ডেঙ্গুমুক্ত রাখতে প্রশাসন, পৌরসভা ও স্থানীয় জনগণ এক হয়ে কাজ করার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে, তা অব্যাহত থাকলে মশার উপদ্রব দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
















