মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র আকার ধারণ করায় বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে সামগ্রিক জাহাজ চলাচল প্রায় ২৮% হ্রাস পেয়েছে। সামুদ্রিক নজরদারি ও পণ্য পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘কেপলার’ জানিয়েছে, গত সপ্তাহে মাত্র ৭৭টি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে পেরেছে। সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় অনেক আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ এড়িয়ে চলায় বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে।
কেপলারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে পণ্যবোঝাই বা কার্গো জাহাজের ক্ষেত্রে এই অচলাবস্থা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে। শেষ এক সপ্তাহে প্রণালিটি দিয়ে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা ৪৫টি থেকে এক ধাক্কায় ৩৩টিতে নেমে এসেছে। হরমুজের মতো অতি সংবেদনশীল নৌপথে হঠাৎ করে পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা এতখানি কমে যাওয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক না থাকলে বিশ্ববাজারে পণ্য সরবরাহ ও জ্বালানি পরিবহনব্যবস্থা যেকোনো মুহূর্তে পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে।
শুধু জাহাজ চলাচল কমাই নয়, জাহাজগুলোর যাত্রাপথেও এসেছে নাটকীয় পরিবর্তন। কেপলারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে হরমুজ অতিক্রমকারী মোট ২৮টি জাহাজের মধ্যে ২১টিই ইরানের বেঁধে দেওয়া বিকল্প পথ ধরে চলাচল করেছে। এসব বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজের প্রচলিত আন্তর্জাতিক রুট পুরোপুরি এড়িয়ে গেছে। এমনকি গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করা ৮টি জাহাজের মধ্যে ৭টিই সরাসরি ইরানের নির্ধারিত নির্দেশিকা মেনে পথ চলেছে। এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, এই জলপথে এখন কার্যত তেহরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণত বিশ্বের মোট উত্তোলিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০% পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ অবরুদ্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রচণ্ড অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে প্রতি ব্যারেল এখন প্রায় ৯৫ থেকে ১০০ মার্কিন ডলারে ()ঠেকেছে।এরপাশাপাশি জাহাজগুলোর যুদ্ধকালীন বিমাপ্রিমিয়াম প্রায়৩০০)ঠেকেছে।এরপাশাপাশি জাহাজগুলোর যুদ্ধকালীন বিমাপ্রিমিয়াম প্রায়৩০০) অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালায়। সেই সংঘাতের পাল্টা জবাব হিসেবে তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিতে চলাচল সীমিত করে দেয়। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাকি বিশ্বের বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই যুদ্ধাবস্থার কারণে পারস্য উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো যেমন রফতানি নিয়ে বিপাকে পড়েছে, তেমনি ইউরোপ ও এশিয়ার আমদানিকারক দেশগুলোও বিকল্প রুটের খোঁজে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোকসান দিচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছেন ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মহসেন রেজাই। তিনি সম্প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে ঘোষণা করেছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালির বাইরেও একটি বিশাল এলাকাকে নতুন ‘নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করবে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরের যে প্রান্ত থেকে ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ শুরু করেছে, ঠিক সেখান থেকেই ইরানের এই নতুন নিয়ন্ত্রণ বলয় শুরু হবে। রেজাই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের অনুমতি ছাড়া এই নতুন অঞ্চলে কোনো বিদেশি জাহাজ প্রবেশ করলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়বে।
এদিকে এমন চরম সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই অদ্ভুত প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির নাম পরিবর্তনের ভাবনা প্রকাশ করেছেন। তিনি এই ঐতিহাসিক প্রণালির নাম বদলে নিজের নামে অর্থাৎ ‘ট্রাম্প প্রণালি’ রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে কেপলার ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মূল নজর এখন ভিন্ন জায়গায়। তাঁরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, ইরানের দেওয়া এই বিধিনিষেধ ও জাহাজ চলাচলের পতন দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে এক মারাত্মক মন্দার দিকে ঠেলে দেয় কিনা।
















