চুয়াডাঙ্গা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে জরুরি ভিত্তিতে দ্রুত পাসপোর্ট পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্র। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জ থেকে আসা অনভিজ্ঞ সাধারণ মানুষ ও চিকিৎসার প্রয়োজনে ভারতে যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা এই প্রতারণার সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছেন। এমন এক গুরুতর ঘটনায় দামুড়হুদা উপজেলার এক ভুক্তভোগী দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়ার আশায় দালালকে দফায় দফায় ২৪ হাজার টাকা দিয়েও গত চার মাসে পাসপোর্ট পাননি। উল্টো দালাল এখন অতিরিক্ত আরও ১০ হাজার টাকা দাবি করছে এবং টাকা ফেরত চাইলে ভুক্তভোগীকে ফোনে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা শহর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে ভিমরুল্লাহ এলাকায় আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসটি অবস্থিত। অফিসের প্রবেশমুখে পা রাখলেই কথিত দালালদের অবাধ দৌরাত্ম্য চোখে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অফিসের মূল ফটকের সামনে প্রতিদিন নিয়মিত ওত পেতে থাকে অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন দালাল। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে কোনো আবেদনকারী আসামাত্রই চক্রের সদস্যরা তাদের পথ আগলে ধরে এবং নানা কৌশলে মিষ্টি কথায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ভান করে। ফরম পূরণ, ছবি তোলা ও ব্যাংকে টাকা জমার জটিলতা কাটানোর কথা বলে তারা সরকারি নির্ধারিত ফির চেয়ে ১৫০% থেকে ২০০% পর্যন্ত অতিরিক্ত টাকা দাবি করে বসে।
দালালদের এমন পাতা ফাঁদে পড়ে চরম সর্বস্বান্ত হয়েছেন দামুড়হুদা উপজেলার পীরপুরকুল্লা গ্রামের মৃত ইসরাফিল মল্লিকের ছেলে এনামুল হক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জটিল রোগে ভুগছেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ভারতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পাসপোর্ট অফিসের মূল ভবনে প্রবেশের আগেই দালাল চক্রের সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচিত সিরাজুল ইসলাম তাঁর পথরোধ করে। সিরাজুল খুব দ্রুততম সময়ে কোনো ভোগান্তি ছাড়া পাসপোর্ট এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রথমে ১২ হাজার টাকায় চুক্তি করে। পরবর্তীতে নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্ট না দিয়ে নথিপত্রে জটিলতার মিথ্যা অজুহাত তুলে ফাইল ছাড়ানোর জন্য আরও ১২ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়।
ভুক্তভোগী এনামুল হকের দেওয়া তথ্যমতে, তিনি দুই দফায় সব মিলিয়ে নগদ ২৪ হাজার টাকা (যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় $২০০ ডলারের সমান) সিরাজুলের হাতে তুলে দেন। অথচ দীর্ঘ চার মাস পার হয়ে গেলেও পাসপোর্ট তাঁর হাতে আসেনি। পাসপোর্ট না পাওয়ায় ভারতে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পথও পুরোপুরি আটকে গেছে। সম্প্রতি পাসপোর্টের খোঁজ নিতে গেলে সিরাজুল সাফ জানিয়ে দেয়, পাসপোর্ট পেতে হলে আরও ১০ হাজার টাকা দিতে হবে। এনামুল যখন আর টাকা না দিয়ে আগের টাকা ফেরত চান, তখন সিরাজুল ও তার সহযোগীরা ফোনে তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল এবং বাড়ি গিয়ে মারধরের হুমকি দেয়।
টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রসঙ্গে অভিযুক্ত সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সে অকপটে টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করে। সিরাজুল কোনো প্রকার সংকোচ না রেখে জানায়, সে একা এই কাজ করে না। চুয়াডাঙ্গা শহরের প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির সহায়তায় সে পাসপোর্টের ফাইল জমা দেয়। এ কাজের জন্য সে ফাইলপ্রতি সামান্য কিছু টাকা কমিশন পায় এবং টাকার সিংহভাগ শহরের সেই সিন্ডিকেটকে দিতে হয়। সে প্রয়োজনে ভুক্তভোগীকে সেই ব্যক্তিদের মুখোমুখি করিয়ে দেওয়ার চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দেয়। এদিকে পাসপোর্ট অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য আবেদনকারীরাও দালালদের এমন অবাধ তৎপরতা বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
চুয়াডাঙ্গা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ-সহকারী পরিচালক এস এম জাকির হোসেন পুরো ঘটনার প্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, পাসপোর্ট তৈরির সরকারি নিয়ম এখন অত্যন্ত স্বচ্ছ, আধুনিক ও সহজ। কোনো আবেদনকারী সরকারি নির্ধারিত ফি সরাসরি ব্যাংকে বা অনুমোদিত অনলাইন মাধ্যমে জমা দিলেই নির্দিষ্ট সময়ে তাঁর পাসপোর্ট পেয়ে যান। এখানে কোনো দালাল ধরার প্রয়োজন নেই এবং মধ্যস্থতাকারী ধরলে প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে শতভাগ বা ১০০%। তিনি জানান, অফিসের দেওয়ালে ও নোটিশ বোর্ডে দালালদের বিষয়ে নিয়মিত সতর্কতা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে কেউ ফাঁদে পা না দেন।
ভুক্তভোগী এনামুল হক ইতিমধ্যে খোয়া যাওয়া টাকা উদ্ধার এবং প্রতারক সিরাজুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, চিকিৎসার টাকা দালালদের পকেটে চলে যাওয়ায় এখন তিনি মারাত্মক কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারি সেবার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা একান্ত প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত সক্রিয় না হলে সাধারণ মানুষের পাসপোর্ট প্রাপ্তির ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতি কোনোভাবেই থামবে না।
















