মশারি টানিয়ে ঘুমিয়েও রক্ষা পেলেন না মিকাইল: ঝিনাইদহে বিষধর সাপের কামড়ে তরুণের মৃত্যু

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কুঠিদুর্গাপুর গ্রামে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। বিষধর সাপের কামড়ে প্রাণ হারিয়েছেন মাত্র ১৮ বছর বয়সী তরুণ মিকাইল হোসেন। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ভোররাতে নিজের ঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় তিনি এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন। সাধারণত গ্রামে ৯০% মানুষ সাপের হাত থেকে বাঁচতে মশারি ব্যবহার করেন, মিকাইলও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। কিন্তু মশারির ভেতরে থাকা সত্ত্বেও বিষধর সাপটি তাকে দংশন করে, যা পুরো এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। নিহতের পরিবার এবং এলাকাবাসীর মধ্যে এখন গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

নিহত মিকাইল হোসেন ছিলেন ওই গ্রামের আসাদুল মন্ডলের ছেলে। প্রতিদিনের মতোই তিনি রাতে নিয়ম মেনে মশারি টানিয়ে ঘুমাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কোনোভাবে একটি বিষধর সাপ মশারির ভেতরে ঢুকে পড়ে অথবা জালের ওপর দিয়েই তাকে ছোবল দেয়। ঘুমের মধ্যেই মিকাইল তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করেন এবং চিৎকার করে ওঠেন। তার চিৎকারে বাড়ির লোকজন দ্রুত ঘরে ঢুকে তাকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পান। তখন ভোররাত হওয়ায় যাতায়াতের কিছুটা সমস্যা থাকলেও পরিবারের সদস্যরা কোনো ঝুঁকি না নিয়ে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

স্বজনরা মিকাইলকে উদ্ধার করে ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত পর্যবেক্ষণ করেন এবং চিকিৎসা শুরু করেন। তবে ততক্ষণে বিষ তার রক্তে অনেকটা ছড়িয়ে পড়েছিল। ডাক্তাররা তাকে জীবনরক্ষাকারী ইনজেকশন বা এন্টিভেনম প্রদান করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মিকাইলের মৃত্যু হয়। হাসপাতালের বারান্দায় তখন তার মা-বাবার আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। মাত্র ১৮ বছরের একটি প্রাণ এভাবে ঝরে যাবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক রাজিব চক্রবর্তী এই অকাল মৃত্যু নিয়ে গণমাধ্যমকে বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, মিকাইলকে যখন হাসপাতালে আনা হয়, তখন তার শরীরে বিষের প্রভাব অনেক বেশি ছিল। সাপে কাটার পর রোগীকে হাসপাতালে আনতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। তিনি আরও বলেন, সাপে কাটার পর অন্তত ৬০ মিনিটের মধ্যে চিকিৎসা শুরু করা গেলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ৯০% পর্যন্ত থাকে। কিন্তু মিকাইলের ক্ষেত্রে সময় পার হয়ে গিয়েছিল অনেক বেশি। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর আমাদের টিম ১০০% চেষ্টা করেছে, কিন্তু তার শরীর এন্টিভেনমে সাড়া দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিল না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা বা তার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে সাপের উপদ্রব প্রায় ৫০% বেড়ে যায়। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় মাটির ঘর বা ঝোপঝাড়ের পাশে যারা থাকেন, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। মিকাইলের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, শুধু মশারি টানিয়েই ১০০% নিশ্চিত থাকা সম্ভব নয়। ঘরের মেঝে বা দেয়ালের ছিদ্র দিয়ে অনেক সময় বিষধর সাপ ভেতরে ঢুকে পড়ে। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়েছেন, সাপে কাটলে ওঝা বা কবিরাজের কাছে গিয়ে সময় নষ্ট করা মানেই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া। সঠিক সময়ে হাসপাতালে আসাই একমাত্র সমাধান।

ঝিনাইদহ সদর থানার ওসি মো. আসাদুজ্জামান জানান, পুলিশের একটি দল হাসপাতাল পরিদর্শন করেছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। সাপের কামড় একটি দুর্ঘটনা হওয়ায় পরিবারের অনুরোধে এবং কোনো অনাপত্তি না থাকায় মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে আইন অনুযায়ী থানায় একটি অপমৃত্যু বা ইউডি মামলা দায়ের করার প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ নিহতের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছে এবং এলাকাবাসীকে সচেতন থাকার অনুরোধ জানিয়েছে।

এই ঘটনার পর থেকে কুঠিদুর্গাপুর গ্রামের মানুষের মধ্যে সাপ নিয়ে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়রা বলছেন, বাড়ির আশেপাশে ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখা এবং কার্বলিক এসিড ব্যবহার করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। মিকাইলের মতো এমন তরুণের অকাল বিয়োগ পুরো জেলার মানুষের জন্য একটি সতর্কবার্তা। গ্রামীণ জনপদে সাপের কামড় প্রতিরোধের জন্য সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রাথমিক চিকিৎসার সুযোগ আরও সহজলভ্য করার দাবি তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। মিকাইলের জানাজায় শত শত মানুষ অংশ নিয়ে তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ