হিমালয়ে ভয়াবহ ‘সুনামি’: তুষারধসে নেপাল-চীনে ১৩০০ মানুষের মৃত্যু, নিখোঁজ হাজার হাজার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

প্রকৃতির রুদ্রমূর্তি যে কতটা ভয়ানক হতে পারে, তার এক মর্মান্তিক সাক্ষী হয়ে রইল হিমালয় পাদদেশের মানুষ। গত ২৬ আগস্ট নেপাল ও চীন সীমান্তে হিমালয়ের একটি বিশাল হিমবাহ ধসে সৃষ্টি হয়েছে এক প্রলয়ঙ্কারী বন্যা ও ভূমিধস। এই মহাবিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত নেপাল ও চীন মিলিয়ে ১,৩০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। তবে সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৫,৬০০ জনের বেশি মানুষ। নিখোঁজদের ফিরে পাওয়ার আশা সময়ের সাথে সাথে ক্ষীণ হয়ে আসছে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল এই ধ্বংসযজ্ঞকে ‘হিমালয়ান সুনামি’ বা হিমালয়ের সুনামি বলে অভিহিত করেছেন। পাহাড়ের ওপর থেকে ধেয়ে আসা বরফ আর পাথরের সেই মরণঘাতী স্রোত সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে।

বিজ্ঞানীরা এই অভাবনীয় দুর্যোগ নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইসিমোড (ICIMOD) তাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানিয়েছে, ২৬ আগস্ট স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ল্যাংটাং লিরুং পর্বতের প্রায় ৫,২০০ মিটার (১৭,০৬০ ফুট) উচ্চতা থেকে বরফ ও পাথরের এক বিশাল খণ্ড ভেঙে পড়ে। এই খণ্ডটি চওড়ায় ছিল প্রায় ১ কিলোমিটার এবং লম্বায় ৭০০ মিটার। যখন এত বড় একটি পাহাড়ের অংশ নিচে আছড়ে পড়ে, তখন তার তীব্রতা ছিল অকল্পনীয়। হিমশিলার সেই স্তূপ প্রায় ৮০০ মিটার নিচে থাকা আরেকটি হিমবাহের ওপর আছড়ে পড়ে এবং নিচের দিকে থাকা লেন্দে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে কয়েক মুহূর্তের জন্য আটকে দেয়। কিন্তু সেই বাঁধ বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। পানির প্রবল চাপে বাঁধ ভেঙে পাথর, কাদা আর বরফের এক বিধ্বংসী স্রোত নিচের দিকে ধেয়ে আসতে থাকে।

ইসিমোডের ভূতত্ত্ববিদ সুদান বিকাশ মহারজন এই দুর্যোগের গতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, “এটি কোনো সাধারণ বন্যা ছিল না। মাত্র সাত মিনিটের মধ্যে এই স্রোত ১,৭০০ মিটার উচ্চতা থেকে নিচে নেমে আসে এবং প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়।” তিনি এই গতিকে একটি বুলেট ট্রেনের গতির সাথে তুলনা করেছেন। পাহাড়ের খাঁজ দিয়ে এত দ্রুত আর শক্তিশালী স্রোত নেমে আসার কারণে এর পথে যা কিছু পড়েছে—ঘরবাড়ি, সেতু, গাছপালা—সবই মাটির সাথে মিশে গেছে। বিশেষ করে নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী বাজার এবং দেবীঘাট এলাকায় এখন শুধুই ধ্বংসস্তূপ আর কাদার পুরু স্তর। অনেক জায়গায় অবকাঠামোর প্রায় ১০০% ধ্বংস হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার ($) ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, গত ৩০ বছরে (১৯৯০ থেকে ২০২০) এই এলাকার হিমবাহগুলো প্রায় ৪৫০ মিটার সংকুচিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলে গিয়ে ভেতরের পাথরগুলো উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পারমাফ্রস্ট বা স্থায়ী বরফের স্তর গলে যাওয়ার ফলে পাহাড়ের ঢালগুলো অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল। যদিও ধসে পড়ার ঠিক আগে কোনো বড় ভূমিকম্প বা অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়নি, তবুও দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ফাটলই হয়তো এই ধসের মূল কারণ। ২০১৫ সালের সেই ভয়াবহ ভূমিকম্পের ফলে হিমালয়ের অনেক পাহাড়ে যে গভীর ফাটল তৈরি হয়েছিল, তাও এই বিপর্যয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ভূবিজ্ঞানী জ্যাকব স্টেইনারের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন এই ধরনের ঘটনার আশঙ্কা প্রায় ৫০% থেকে ৮০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিপর্যস্ত এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, এক সময়ের হাসিখুশি জনপদগুলো এখন ভুতুড়ে এলাকায় পরিণত হয়েছে। কাদার ওপর দিয়ে স্বজন হারানো মানুষের আর্তনাদ আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলছে। নেপালের উদ্ধারকারী দলগুলো দিনরাত কাজ করলেও নিখোঁজ ৫,৬০০ জনের হদিস পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ অনেক গ্রাম এখন ১০ থেকে ১৫ ফুট কাদার নিচে চাপা পড়ে আছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হলেও দুর্যোগের বিশালতার তুলনায় তা অত্যন্ত সামান্য। ত্রাণ কার্যে অংশ নেওয়া এক স্বেচ্ছাসেবক জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য অন্তত ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ($৫০০,০০০,০০০) বেশি জরুরি তহবিলের প্রয়োজন হতে পারে।

অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে এমন বড় বিপদের কি কোনো পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব ছিল না? বিজ্ঞানীরা বলছেন, ধসে পড়ার কয়েক সপ্তাহ আগে হিমবাহের গতি কিছুটা অস্বাভাবিক ছিল এবং বরফ গলা পানির পরিমাণও বেড়েছিল। কিন্তু এই লক্ষণগুলো দেখে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব ছিল না যে, ঠিক কোন মুহূর্তে পাহাড় ধসে পড়বে। হিমালয় অঞ্চলে এমন হাজার হাজার পাহাড় রয়েছে, যাদের প্রতি মুহূর্তের নজরদারি করা প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল। তবে জ্যাকব স্টেইনার আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই ২৬ আগস্টের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে। যাতে অন্তত মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য কিছুটা সময় পাওয়া যায়।

এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে হলে এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল জানিয়েছেন, নেপাল ও চীনের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং হিমবাহগুলোর ওপর ২৪ ঘণ্টা নজরদারি রাখার মতো একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্ববাসীকে এখনই সচেতন হতে হবে, নাহলে হিমালয়ের এমন ‘সুনামি’ বারবার ফিরে আসতে পারে। বর্তমানে পুরো উপত্যকাজুড়ে যে হাহাকার চলছে, তা কেবল নেপালের নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্যই একটি বড় সতর্কবার্তা। প্রকৃতির ওপর মানুষের হস্তক্ষেপ যে কতটা চড়া দামে শোধ করতে হয়, এই ১,৩০০ প্রাণ আর হাজার হাজার নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা তারই প্রমাণ।

সম্পর্কিত নিবন্ধ