পাহাড়ের বুকে সম্প্রীতির মহোৎসব: দীঘিনালায় শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীতে মিলনমেলা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মো: আল আমিন, দীঘিনালা

খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার সবুজ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে আজ এক অন্যরকম উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা গেছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ৫২৫৩তম আবির্ভাব তিথি বা শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে পাহাড়ি এই জনপদ আজ সেজেছে বর্ণিল সাজে। কেবল হিন্দু সম্প্রদায় নয়, বরং বিভিন্ন জাতিসত্তা ও ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি রূপ নিয়েছে এক পাহারী মিলনমেলায়। শুক্রবার সকাল থেকেই দীঘিনালার অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান প্রধান সড়কে ছিল ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়। শঙ্খের ধ্বনি আর উলুধ্বনিতে চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে, যা পুরো এলাকায় এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করে।

আজকের এই বিশেষ দিনটি উপলক্ষে সকাল ১১টার দিকে উপজেলার শ্রীশ্রী সনাতন শিব মন্দির প্রাঙ্গণে এক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দীঘিনালা জোনের জোন কমান্ডার লে. কর্নেল মো. আল-আমিন, এসইউপি, পিএসসি। তাঁর উপস্থিতি স্থানীয়দের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ জোগায়। সভার শুরুতেই শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও দর্শনের ওপর আলোকপাত করা হয়। বক্তারা বলেন, শ্রীকৃষ্ণের মূল শিক্ষা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। আজকের অস্থির পৃথিবীতে তাঁর এই শিক্ষা ১০০% প্রাসঙ্গিক। এই আলোচনা সভায় ৫ শতাধিক ভক্তের পাশাপাশি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন, যা অনুষ্ঠানটিকে পূর্ণতা দান করে।

আলোচনা সভার আগে সকালের দিকে দীঘিনালার শ্রীশ্রী নারায়ণ মন্দির থেকে একটি বিশাল ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি উপজেলার প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করার সময় এক মনোরম দৃশ্যের অবতারণা হয়। ব্যানার, ফেস্টুন আর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নানা রূপের প্রতিকৃতি নিয়ে ভক্তরা যখন রাস্তায় নামেন, তখন রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ হাত নেড়ে তাদের অভিবাদন জানান। আয়োজক কমিটি জানিয়েছে, এবারের শোভাযাত্রায় ভক্তদের উপস্থিতি গত বছরের তুলনায় প্রায় ২০% বেশি ছিল। অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা ১০০% সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। শান্তিপূর্ণভাবে শোভাযাত্রাটি শেষ হওয়ার পর তা শ্রীশ্রী সনাতন শিব মন্দিরে গিয়ে মিলিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে লে. কর্নেল মো. আল-আমিন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। তিনি বলেন, “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।” তাঁর এই কথাটি উপস্থিত সকলের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীঘিনালা জোনের পক্ষ থেকে সবসময় পাহাড়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে এই ভ্রাতৃত্বের বন্ধন চিরস্থায়ী করার ওপর গুরুত্ব দেন। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে তিনি জন্মাষ্টমী উদযাপন কমিটির হাতে জোন কমান্ডারের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে নগদ অর্থ তুলে দেন। স্থানীয় বাজারে এই উপহারের পরিমাণ প্রায় $৩০০ ডলারের (প্রায় ৩৫,০০০ টাকা) সমতুল্য, যা উৎসবের খরচ মেটাতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আয়োজকরা জানান।

এবারের জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের এক অনন্য মেলবন্ধন দেখা গেছে। বিশেষ অতিথি হিসেবে দীঘিনালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল বাহার চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া দীঘিনালা জোনের অ্যাডজুটেন্ট লে. আজমাঈন আহনাফ বিন খালেদ, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য শান্তি প্রিয় চাকমা এবং দীঘিনালা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন মঞ্চে আসীন ছিলেন। পাহাড়ে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের এমন সহাবস্থান বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। উপস্থিত ভক্তরা জানান, যখন সব দলের ও সব জাতের নেতারা একসাথে উৎসবে শামিল হন, তখন তারা নিজেদের অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করেন।

শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন কমিটির সভাপতি সুশীল জীবন ত্রিপুরা এবং সাধারণ সম্পাদক মিটু চৌধুরী অনুষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। তারা জানান, বর্তমান সরকারের আমলে তারা অত্যন্ত নির্ভয়ে এবং আনন্দের সাথে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে পারছেন। কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জন্মাষ্টমীর এই আয়োজনে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রায় ১০% ডিসকাউন্টে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করেছেন, যা সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্যেরই একটি অংশ। দুপুরের দিকে মন্দিরে আসা ভক্তদের মাঝে সুস্বাদু প্রসাদ বিতরণ করা হয়। প্রসাদ পেয়ে ছোট ছোট শিশুদের মুখে যে হাসির ঝিলিক দেখা গেছে, তা ছিল দেখার মতো।

দীঘিনালার সাধারণ মানুষের মতে, শ্রীকৃষ্ণের এই ৫২৫৩তম জন্মজয়ন্তী কেবল একটি পূজা নয়, এটি মানুষের সাথে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব কমিয়ে আনার একটি মাধ্যম। পাহাড়ে মাঝেমধ্যেই যে অস্থিরতার খবর পাওয়া যায়, এই ধরনের ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবগুলো সেই ক্ষত নিরাময়ে কাজ করে। শান্তি প্রিয় চাকমা তাঁর বক্তব্যে বলেন, পাহাড়ের উন্নয়ন তখনি সম্ভব যখন আমরা একে অপরের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি ১০০% সম্মান দেখাব। বিকেলের দিকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের ভজন কীর্তন করেন। সব মিলিয়ে দীঘিনালার এবারের জন্মাষ্টমী আয়োজন ছিল সফল এবং অত্যন্ত অর্থবহ।

রাত নামার সাথে সাথে মন্দির প্রাঙ্গণগুলোতে আলোকসজ্জার ঝলকানি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভক্তদের মতে, আজকের এই প্রার্থনা সভায় তারা কেবল নিজেদের জন্য নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও শান্তির জন্য আশীর্বাদ চেয়েছেন। দেশ থেকে সব ধরনের হানাহানি আর হিংসা দূর হয়ে যাক এটাই ছিল আজকের দিনের প্রধান প্রার্থনা। দীঘিনালার আকাশ আজ যেন এক শান্তির বার্তা বয়ে এনেছে, যা সামনের দিনগুলোতে পাহাড়ে বসবাসরত সকল মানুষের মনে ঐক্যের বীজ বুনে দেবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতে এমন প্রতিটি উৎসবে তারা জনগণের পাশে থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদান করবেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ